| বাংলার জন্য ক্লিক করুন
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
   * সুযোগ আছে বিএসসি অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে   * উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী ....ড. এফ এইচ আনসারী   * সবার মতামত নিয়েই গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষায় ব্যবস্থা :প্রধানমন্ত্রী   * ডুবোচরে আটকে আছে ১৫টি মালবাহী জাহাজ   * নিম্নকক্ষে নিয়ন্ত্রণ হারালেন ট্রাম্প   * শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব ---ব্যারিষ্টার নাজমুল হুদা   * আমার সংসার টিকে আছে এইতো বেশি   * গোপালগঞ্জে মোবাইলে প্রেমের ফাঁদ চক্রের ৫ সদস্য গ্রেফতার   * সাটুরিয়ায় দলিল হাতে ঘুরছে ভূমিহীন ২০ পরিবার   * এ্যরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পেশায় আসতে চাইলে  

   উপ-সম্পাদকীয় -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
মাদক দমন যেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিধন না হয়

ডিটিভি বাংলা নিউজঃ

ক্ষমতাসীন সরকার যখনই কিছু করে, তার একটি কেতাবি ভাষা থাকে। জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় চমক থাকে। তার সাথে সাথে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করে। রাজনীতিকেরা যেমন বলে থাকেন- ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। তার উল্টোটি আমাদের দেশের ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তারা মনে করেন- রাষ্ট্রের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। আর গণতন্ত্র সম্পর্কে আব্রাহাম লিঙ্কনের সেই বহুল উচ্চারিত প্রবাদটি এভাবে বলা যায়- ‘ডেমোক্র্যাসি অব দ্য পার্টি, বাই দ্য পার্টি অ্যান্ড ফর দ্য পার্টি।’ ইতোমধ্যে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা যদি সত্যি হয়, তবে তার সর্বশেষ নমুনা হলো মাদক দমনের নামে দেশব্যাপী তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ বেপরোয়া পাঁয়তারা। এটা যে জনগণকে প্রতারিত করার একটি কৌশল, তা বোঝা যায় মাদকবিরোধী অভিযানের লক্ষ্য ও প্রক্রিয়া দেখে। গাছের গোড়া উপড়ে না ফেলে দৃশ্যমান শাখা-প্রশাখা কেটে নেয়া যেমন নিরর্থক, তেমনি মাদক সেবনকারীদের ধরে ধরে নিধন করাও অর্থহীন। চলমান অভিযানে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গত ১০ দিনে মাদক কারবারিদের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৪১ জন নিহত হয়েছে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ মাসের ১৫ তারিখে দুইজন, ১৭ তারিখে তিনজন, ১৮ তে একজন, ১৯ শে তিনজন, ২০ শে চারজন, ২১-এ ৯ জন, ২২ শে ১২ জন ও ২৩ শে সাতজন নিহত হয়েছে। এ কলামে একবার শিরোনাম ছিল ‘বন্দুকযুদ্ধ : যে গল্পের শেষ নেই’, সেই একই গল্প প্রতিদিন নানা রঙে, নানা ঢঙে বয়ান করা হচ্ছে। ২৩ তারিখ রাতের ‘বন্দুকযুদ্ধ’কে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য বলা হয়েছে, এ ঘটনায় কিছু পুলিশও আহত হয়েছে।
মিথ্যাকে সত্য করার জন্য যদি ১০০ মিথ্যা কথা বলা হয়, তাহলে মিথ্যাটি সত্য হয়ে যায় না। চলমান অভিযানবিরোধী একটি জাতীয় ঐকমত্য ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। ডান-বাম, পূর্ব-পশ্চিমের সব মত ও পথের ধারকেরা একবাক্যে এর প্রতিবাদ করছে। কিন্তু সরকার অন্যসব বিষয়ের মতো এ ব্যাপারেও অনড়। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, আরো ৫০০ জনের নাম রয়েছে হিট লিস্টে। সেই সাথে ঈদের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘মাদকবাণিজ্য’-এর অভিযোগ বেশ জোরেশোরেই গণমাধ্যমে উত্থাপন হয়েছে। এরা বিরোধী দল ও স্থানীয় অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের হুমকি-ধমকি দিয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। তাই বলা দরকার, মাদক দমন অভিযান যেন প্রতিপক্ষ দমন অভিযানে পরিণত না হয়।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “বিএনপি মাদকবিরোধী অভিযান চায়; কিন্তু সেটি অরাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হতে হবে। তাই ক্রসফায়ার নয়, আইনের আওতায় এনে তাদের বিচার করতে হবে। ২৩ মে ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে তিনি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তাদের নেতাকর্মী হত্যার অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা খন্দকার মোশাররফ হেসেন অভিযোগ করেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়ী, এমনকি উপজেলা পর্যায়ের নেতারাও এই ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।”
অপর দিকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’সহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে মাদকের ভয়াবহতা নিরসনে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবি। দলটি বলেছে, যারা বিদেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে মাদক এনে বিস্তৃত চক্রের মাধ্যমে গ্রামপর্যায়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে, সেই উৎসমূল বন্ধ না করে, তাদের বিচারের আওতায় না এনে কিছু চুনোপুঁটি মাদকবিক্রেতাকে হত্যা করে এই মারাত্মক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বিবৃতিতে মাদক দমন অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করা হয়।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, সমস্যা সমাধানের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সিপিবি পরোক্ষভাবে এক দিক নির্দেশ করলেও জাতীয় পার্টি প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অনেকটা প্রত্যক্ষভাবেই বলেছেন : ‘মাদক সম্রাট সংসদেই আছে, তাদের ফাঁসিতে ঝুলান।’ সিভিল সোসাইটিতে এ ধরনের নির্বিচার হত্যায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘মানুষের জীবন কেড়ে নেয়ার অধিকার কারো নেই।’ সরকারি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এ হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানের সময় মানবাধিকারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাথায় রাখতে হবে।’ কমিশন বলেছে, ‘বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ড তারা সমর্থন করে না।’
মাদক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘বন্দুকযুদ্ধে’র মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে মাদকের ব্যবহার নির্মূল করা সম্ভব নয়। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুরূপ মত পোষণ করেন, তবুও কার্যক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি এর ব্যতিক্রম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার ও কারাদণ্ড দিচ্ছে; কিন্তু অভিযানদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তারা মাদক ব্যবহারকারী ও বিক্রয়কারী সাধারণ মানুষকে হত্যা করাই আসল কাজ মনে করছে।
সাধারণভাবে বোঝা যায়, মাদকদ্রব্যের তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথমত উৎপাদন, দ্বিতীয়ত সরবরাহ এবং তৃতীয়ত মাদক ব্যবহারকারী। মাদক উৎপাদন বাংলাদেশে হচ্ছে না। প্রতিবেশী মিয়ানমার এর মূল উৎস। ভারত থেকে ইয়াবা না হলেও মদ-ফেনসিডিল ব্যাপক হারে আসছে। তাহলে বোঝা যায়, সরকারের খোলা সীমান্ত নীতি মাদক উৎপাদনে সহায়তা দিচ্ছে। আকস্মিকভাবে দেশের অভ্যন্তরে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও সীমান্তে কঠোরতম ব্যবস্থার কথা জান যায়নি। যদিও মাঝে মধ্যে ছিটেফোঁটা অভিযানের খবর প্রকাশ হয়েছে। এবার আসা যাক সরবরাহকারী, যারা ইয়াবা ও অন্যান্য নেশাদ্রব্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এরা নানাভাবে কারবার করছে। প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বলছে, বেশির ভাগ সরবরাহকারী বা কারবারী ক্ষমতাসীন দলের লোক।
ক্ষমতাসীনদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কারবার পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি যেসব লোক ধরা পড়েছে, এদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। কারো নাম উল্লেখ না করেই বলা যায়, আপনার এলাকায় কারা এর সাথে জড়িত। এ কথার অর্থ এই নয় যে, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নেশাকে অনুমোদন করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক কালচার অনুযায়ী, অপরাধীরা ক্ষমতাসীন দলে নাম লেখায় এবং তাদের সহায়তা পায়। অপরাধী যদি ক্ষমতাসীন দলের লোক হয়, তাহলে তার সাত খুন মাফ। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি তারা চালু করেছে, মাদক কারবারিরা তার ষোলআনা সুযোগ নিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণের মাদক সম্রাট বদি মিয়ার নাম এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বদির বিরুদ্ধে তথ্য আছে; প্রমাণ নেই। এ কথার অর্থ কি এই সরকার তার বিরুদ্ধে প্রমাণ দিতে অক্ষম? অথচ অসংখ্য ক্ষেত্রে তারা প্রমাণ ছাড়াই মামলা এমনকি হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। এমন লোকদের ক্রসফায়ারে দিচ্ছে, যারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতসীন দলের বিরোধী। ‘বন্দুকযুদ্ধের’ মুখোমুখি যুবকের পিতা-মাতা তার সন্তানকে নিরপরাধ দাবি করেছেন, এমনকি মামলা করেছেন- এ রকম উদাহরণ বিরল নয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে খবর এসেছে, ৪৫ মাদক গডফাদার ঢাকায়। এর মধ্যে পৃষ্ঠপোষক পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতা ও তিন পুলিশ কর্মকর্তা। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে- এ রকম খবর জনগণ এখনো পায়নি।

অস্বীকার করার উপায় নেই- সরকার যখনই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড অতীতে পরিচালনা করেছে, বিরোধী দলের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এর কবলে পড়েছে। জঙ্গিবিরোধী অভিযান, সন্ত্রাস দমন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ- সব ক্ষেত্রেই স্থানীয় উল্লেখযোগ্য নেতাকর্মীরা পুলিশের অন্যায় সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছে। কী মনে করে রমজান মাসেই এ অভিযানগুলো বেশি পরিচালিত হয়। এ সময় ভালো মানুষ নিশ্চিন্তে ঘরে ফেরে আর এ সুযোগটি হেলায় হারাতে চায় না সরকার। মানুষ মারার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের জুড়ি নেই। স্বাধীনতার প্রাথমিক সময়ে জাসদ অভিযোগ করেছিল, তাদের ৪০ হাজার নেতাকর্মী হত্যা করেছে রক্ষীবাহিনী। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত যারা এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে, তাদের গরিষ্ঠ অংশই আওয়ামী জামানায়। বিশেষ করে এ সময়ে যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে, স্বাধীনতার বিগত সময়ে একত্র করলেও তত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন, তাকে এভাবে হত্যা করা যায় না। কোনো সভ্য সমাজের আইনকানুন তা অনুমোদন করে না। বর্তমানে মাদকপ্রবণ ও মাদক প্রবেশদদ্বার বাদ রেখে যে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, তা আইনের চোখে অচল হতে বাধ্য। সমাজতত্ত্ব বলে, এ ধরনের ব্যবস্থায় প্রতিশোধের হিংসা প্রজ্বলিত হয়। সন্ত্রাস উৎসাহিত হয়। সুতরাং এই অন্যায় ‘বন্দুকযুদ্ধ’ অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য- ১. রাষ্ট্রকে নৈতিক হতে হবে, ২. শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে, ৩. মাদক বেচাকেনার পরিবেশের পরিসমাপ্তি ঘটাতে হবে, ৪. উৎসমূল : উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করতে হবে, ৫. বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান হতে হবে। আশু ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশি জরিপ নয়, নিরপেক্ষ গবেষণা সংস্থার মাধ্যমে নেশার কারণ, ব্যাপ্তি ও গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করতে হবে। গণমাধ্যম ও শিক্ষক-অভিভাবককে কাজে লাগাতে হবে। রাজনীতি নয়, সমাজকে জাগ্রত করার মধ্যে এর সমাধান খুঁজতে হবে।

মাদক দমন যেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিধন না হয়
                                  

ডিটিভি বাংলা নিউজঃ

ক্ষমতাসীন সরকার যখনই কিছু করে, তার একটি কেতাবি ভাষা থাকে। জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় চমক থাকে। তার সাথে সাথে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করে। রাজনীতিকেরা যেমন বলে থাকেন- ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। তার উল্টোটি আমাদের দেশের ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তারা মনে করেন- রাষ্ট্রের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। আর গণতন্ত্র সম্পর্কে আব্রাহাম লিঙ্কনের সেই বহুল উচ্চারিত প্রবাদটি এভাবে বলা যায়- ‘ডেমোক্র্যাসি অব দ্য পার্টি, বাই দ্য পার্টি অ্যান্ড ফর দ্য পার্টি।’ ইতোমধ্যে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা যদি সত্যি হয়, তবে তার সর্বশেষ নমুনা হলো মাদক দমনের নামে দেশব্যাপী তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ বেপরোয়া পাঁয়তারা। এটা যে জনগণকে প্রতারিত করার একটি কৌশল, তা বোঝা যায় মাদকবিরোধী অভিযানের লক্ষ্য ও প্রক্রিয়া দেখে। গাছের গোড়া উপড়ে না ফেলে দৃশ্যমান শাখা-প্রশাখা কেটে নেয়া যেমন নিরর্থক, তেমনি মাদক সেবনকারীদের ধরে ধরে নিধন করাও অর্থহীন। চলমান অভিযানে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গত ১০ দিনে মাদক কারবারিদের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৪১ জন নিহত হয়েছে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ মাসের ১৫ তারিখে দুইজন, ১৭ তারিখে তিনজন, ১৮ তে একজন, ১৯ শে তিনজন, ২০ শে চারজন, ২১-এ ৯ জন, ২২ শে ১২ জন ও ২৩ শে সাতজন নিহত হয়েছে। এ কলামে একবার শিরোনাম ছিল ‘বন্দুকযুদ্ধ : যে গল্পের শেষ নেই’, সেই একই গল্প প্রতিদিন নানা রঙে, নানা ঢঙে বয়ান করা হচ্ছে। ২৩ তারিখ রাতের ‘বন্দুকযুদ্ধ’কে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য বলা হয়েছে, এ ঘটনায় কিছু পুলিশও আহত হয়েছে।
মিথ্যাকে সত্য করার জন্য যদি ১০০ মিথ্যা কথা বলা হয়, তাহলে মিথ্যাটি সত্য হয়ে যায় না। চলমান অভিযানবিরোধী একটি জাতীয় ঐকমত্য ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। ডান-বাম, পূর্ব-পশ্চিমের সব মত ও পথের ধারকেরা একবাক্যে এর প্রতিবাদ করছে। কিন্তু সরকার অন্যসব বিষয়ের মতো এ ব্যাপারেও অনড়। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, আরো ৫০০ জনের নাম রয়েছে হিট লিস্টে। সেই সাথে ঈদের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘মাদকবাণিজ্য’-এর অভিযোগ বেশ জোরেশোরেই গণমাধ্যমে উত্থাপন হয়েছে। এরা বিরোধী দল ও স্থানীয় অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের হুমকি-ধমকি দিয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। তাই বলা দরকার, মাদক দমন অভিযান যেন প্রতিপক্ষ দমন অভিযানে পরিণত না হয়।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “বিএনপি মাদকবিরোধী অভিযান চায়; কিন্তু সেটি অরাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হতে হবে। তাই ক্রসফায়ার নয়, আইনের আওতায় এনে তাদের বিচার করতে হবে। ২৩ মে ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে তিনি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তাদের নেতাকর্মী হত্যার অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা খন্দকার মোশাররফ হেসেন অভিযোগ করেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়ী, এমনকি উপজেলা পর্যায়ের নেতারাও এই ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।”
অপর দিকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’সহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে মাদকের ভয়াবহতা নিরসনে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবি। দলটি বলেছে, যারা বিদেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে মাদক এনে বিস্তৃত চক্রের মাধ্যমে গ্রামপর্যায়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে, সেই উৎসমূল বন্ধ না করে, তাদের বিচারের আওতায় না এনে কিছু চুনোপুঁটি মাদকবিক্রেতাকে হত্যা করে এই মারাত্মক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বিবৃতিতে মাদক দমন অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করা হয়।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, সমস্যা সমাধানের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সিপিবি পরোক্ষভাবে এক দিক নির্দেশ করলেও জাতীয় পার্টি প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অনেকটা প্রত্যক্ষভাবেই বলেছেন : ‘মাদক সম্রাট সংসদেই আছে, তাদের ফাঁসিতে ঝুলান।’ সিভিল সোসাইটিতে এ ধরনের নির্বিচার হত্যায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘মানুষের জীবন কেড়ে নেয়ার অধিকার কারো নেই।’ সরকারি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এ হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানের সময় মানবাধিকারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাথায় রাখতে হবে।’ কমিশন বলেছে, ‘বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ড তারা সমর্থন করে না।’
মাদক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘বন্দুকযুদ্ধে’র মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে মাদকের ব্যবহার নির্মূল করা সম্ভব নয়। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুরূপ মত পোষণ করেন, তবুও কার্যক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি এর ব্যতিক্রম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার ও কারাদণ্ড দিচ্ছে; কিন্তু অভিযানদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তারা মাদক ব্যবহারকারী ও বিক্রয়কারী সাধারণ মানুষকে হত্যা করাই আসল কাজ মনে করছে।
সাধারণভাবে বোঝা যায়, মাদকদ্রব্যের তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথমত উৎপাদন, দ্বিতীয়ত সরবরাহ এবং তৃতীয়ত মাদক ব্যবহারকারী। মাদক উৎপাদন বাংলাদেশে হচ্ছে না। প্রতিবেশী মিয়ানমার এর মূল উৎস। ভারত থেকে ইয়াবা না হলেও মদ-ফেনসিডিল ব্যাপক হারে আসছে। তাহলে বোঝা যায়, সরকারের খোলা সীমান্ত নীতি মাদক উৎপাদনে সহায়তা দিচ্ছে। আকস্মিকভাবে দেশের অভ্যন্তরে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও সীমান্তে কঠোরতম ব্যবস্থার কথা জান যায়নি। যদিও মাঝে মধ্যে ছিটেফোঁটা অভিযানের খবর প্রকাশ হয়েছে। এবার আসা যাক সরবরাহকারী, যারা ইয়াবা ও অন্যান্য নেশাদ্রব্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এরা নানাভাবে কারবার করছে। প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বলছে, বেশির ভাগ সরবরাহকারী বা কারবারী ক্ষমতাসীন দলের লোক।
ক্ষমতাসীনদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কারবার পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি যেসব লোক ধরা পড়েছে, এদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। কারো নাম উল্লেখ না করেই বলা যায়, আপনার এলাকায় কারা এর সাথে জড়িত। এ কথার অর্থ এই নয় যে, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নেশাকে অনুমোদন করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক কালচার অনুযায়ী, অপরাধীরা ক্ষমতাসীন দলে নাম লেখায় এবং তাদের সহায়তা পায়। অপরাধী যদি ক্ষমতাসীন দলের লোক হয়, তাহলে তার সাত খুন মাফ। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি তারা চালু করেছে, মাদক কারবারিরা তার ষোলআনা সুযোগ নিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণের মাদক সম্রাট বদি মিয়ার নাম এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বদির বিরুদ্ধে তথ্য আছে; প্রমাণ নেই। এ কথার অর্থ কি এই সরকার তার বিরুদ্ধে প্রমাণ দিতে অক্ষম? অথচ অসংখ্য ক্ষেত্রে তারা প্রমাণ ছাড়াই মামলা এমনকি হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। এমন লোকদের ক্রসফায়ারে দিচ্ছে, যারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতসীন দলের বিরোধী। ‘বন্দুকযুদ্ধের’ মুখোমুখি যুবকের পিতা-মাতা তার সন্তানকে নিরপরাধ দাবি করেছেন, এমনকি মামলা করেছেন- এ রকম উদাহরণ বিরল নয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে খবর এসেছে, ৪৫ মাদক গডফাদার ঢাকায়। এর মধ্যে পৃষ্ঠপোষক পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতা ও তিন পুলিশ কর্মকর্তা। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে- এ রকম খবর জনগণ এখনো পায়নি।

অস্বীকার করার উপায় নেই- সরকার যখনই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড অতীতে পরিচালনা করেছে, বিরোধী দলের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এর কবলে পড়েছে। জঙ্গিবিরোধী অভিযান, সন্ত্রাস দমন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ- সব ক্ষেত্রেই স্থানীয় উল্লেখযোগ্য নেতাকর্মীরা পুলিশের অন্যায় সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছে। কী মনে করে রমজান মাসেই এ অভিযানগুলো বেশি পরিচালিত হয়। এ সময় ভালো মানুষ নিশ্চিন্তে ঘরে ফেরে আর এ সুযোগটি হেলায় হারাতে চায় না সরকার। মানুষ মারার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের জুড়ি নেই। স্বাধীনতার প্রাথমিক সময়ে জাসদ অভিযোগ করেছিল, তাদের ৪০ হাজার নেতাকর্মী হত্যা করেছে রক্ষীবাহিনী। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত যারা এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে, তাদের গরিষ্ঠ অংশই আওয়ামী জামানায়। বিশেষ করে এ সময়ে যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে, স্বাধীনতার বিগত সময়ে একত্র করলেও তত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন, তাকে এভাবে হত্যা করা যায় না। কোনো সভ্য সমাজের আইনকানুন তা অনুমোদন করে না। বর্তমানে মাদকপ্রবণ ও মাদক প্রবেশদদ্বার বাদ রেখে যে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, তা আইনের চোখে অচল হতে বাধ্য। সমাজতত্ত্ব বলে, এ ধরনের ব্যবস্থায় প্রতিশোধের হিংসা প্রজ্বলিত হয়। সন্ত্রাস উৎসাহিত হয়। সুতরাং এই অন্যায় ‘বন্দুকযুদ্ধ’ অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য- ১. রাষ্ট্রকে নৈতিক হতে হবে, ২. শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে, ৩. মাদক বেচাকেনার পরিবেশের পরিসমাপ্তি ঘটাতে হবে, ৪. উৎসমূল : উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করতে হবে, ৫. বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান হতে হবে। আশু ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশি জরিপ নয়, নিরপেক্ষ গবেষণা সংস্থার মাধ্যমে নেশার কারণ, ব্যাপ্তি ও গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করতে হবে। গণমাধ্যম ও শিক্ষক-অভিভাবককে কাজে লাগাতে হবে। রাজনীতি নয়, সমাজকে জাগ্রত করার মধ্যে এর সমাধান খুঁজতে হবে।

ভাসানীর ফারাক্কা মিছিল
                                  

ডিটিভি বাংলা নিউজঃ

বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা অধ্যাপক ক’দিন আগে ঢাকার প্রেস ক্লাবের এক সভায় বলেছেন, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী হলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি ফারাক্কা ব্যারাজ তৈরি হলে বাংলাদেশ পানির অভাবে পড়বে বলে উপলব্ধি করেছিলেন। তার বক্তব্য মনে হয় ঠিক ঐতিহাসিক নয়। কেননা, ভারত ফারাক্কা ব্যারাজ তৈরির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ১৯৫৪ সালে। এ সময় সাবেক পাকিস্তান সরকার ফারাক্কা ব্যারাজ তৈরির বিপক্ষে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। অন্য দিকে ভাসানী কেবলই করে চলেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা। তিনি এ সময় ছিলেন একজন কড়া বিপ্লবী। তিনি ফারাক্কা ব্যারাজ নিয়ে এ সময় কোনো কথাই বলেননি। অনেক পরে তিনি করেছিলেন ফারাক্কা মিছিল। আর এই মিছিল করতে পেরেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিশেষ সহযোগিতায়। এটা তার একক প্রচেষ্টার ফল ছিল না। কিন্তু এখন কিছু সংখ্যক বুদ্ধিজীবী বলতে চাচ্ছেন, এই মিছিল ছিল কেবলই ভাসানীর একক উদ্যোগের ফল।

অনেকেই জানেন না যে, ভাসানীর মিছিলের একদিন আগে তিনি রাজশাহীতে ঘরোয়া সভায় প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, তড়িঘড়ি করে সাবেক পাকিস্তান ভেঙে দেয়া ভুল হয়েছে। ভেঙে দেয়া না হলে গঙ্গার পানি পাওয়া অনেক সহজসাধ্য হতো। কেননা ভারতের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হতো পূব ও পশ্চিম থেকে, যা এখন আর সম্ভব নয়। ভাসানীর রাজনৈতিক চেতনার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আসা অনেককে বিস্মিত করেছিল। কারণ ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় ভাসানী বলেছিলেন, তিনি ভোটে বিশ্বাস করেন না। তিনি চান ভোটের আগে ভাত। কিন্তু সেই তিনি, আবার ভোট হবার পরে বলেছিলেন, ভোট আসলে হয়েছে গণভোট। পশ্চিম পাকিস্তানকে জানাতে হবে ‘স্লামালেকুম’।
ভাসানীকে সবাই জানত চীনপন্থী কমিউনিস্টদের পক্ষে। কিন্তু তিনি একাত্তরে যান ভারতে। কলকাতায় বন্দী হয়ে থাকেন ভারতীয় গোয়েন্দাদের হাতে। ভাসানীর রাজনীতি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল খুবই কঠিন। এই ভাসানী দেশে ফিরে হয়ে ওঠেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একজন সহযোগী। আর তার নির্দেশেই তিনি দেন ফারাক্কা মিছিলের নেতৃত্ব। এই হলো বিখ্যাত ফারাক্কা মিছিলের পটভূমি। আমি তাই ব্যক্তিগতভাবে খ্যাতনামা অধ্যাপকের বচনের সাথে ঐকমত্য পোষণ করতে পারছি না। সে সময় থেকে এখন নদীর পানির সমস্যা হয়ে উঠেছে আরো অনেক জটিল।

আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি পানি আসে গঙ্গা নদী দিয়ে নয়, ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে। ব্রহ্মপুত্র নদের দৈর্ঘ্য ২৬৭০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তিস্থল হল চীনে তিব্বতের মানস সরোবর থেকে। যেসব নদীর উদ্ভব হ্রদ থেকে হয়, তাদের আমরা বাংলায় নদী না বলে উল্লেখ করি নদ বলে। যেমন সিন্ধু নদ, ব্রহ্মপুত্র নদ, নীলনদ। গঙ্গা নদী কোনো হ্রদ থেকে হয়নি। এর উদ্ভব হয়েছে হিমালয়ের তুষার নদী গঙ্গোত্রী থেকে। ব্রহ্মপুত্র নদকে তিব্বতে বলা হয়, সাং-পো (ঞংধহম-চড়)। ব্রহ্মপুত্র নদের ১৪৪৩ কিলোমিটার পড়েছে তিব্বতের মধ্যে। একে তাই প্রায় বলা চলে তিব্বতের নদী।
চীন সরকার চাচ্ছে এই নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ করে তিব্বতে পানি সেচব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি উন্নয়ন। চীন এটা করলে বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে পানি আসা অনেক কমে যাবে। আগে ছিল কেবল গঙ্গার পানির সমস্যা। কিন্তু এখন আমাদের ভাবতে হবে ব্রহ্মপুত্রের পানি সমস্যা নিয়েও। চীনের সঙ্গে আমাদের হওয়া উচিত পানি সমস্যা সমাধানের জন্য বিশেষ চুক্তি। না হলে আমাদের পানি-সমস্যা নিকট ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে খুবই জটিল।

ভারত ফারাক্কা ব্যারাজ করেছিল তিন কারণে। কলকাতা বন্দরে নাব্যতা রক্ষা; ফারাক্কা ব্যারাজের ওপর দিয়ে রেলপথ ও সড়কপথ নির্মাণ করে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশের যোগাযোগ স্থাপন এবং ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে গঙ্গার পানি আটকিয়ে যুদ্ধের সময় সাবেক পাকিস্তানকে যুদ্ধে কাবু করা। চীন সাং-পো নদীর ওপর যে ব্যারাজ তৈরি করছে, তার লক্ষ্য কৃষি-উন্নয়ন। তাই ফারাক্কা ব্যারাজ আর সাং-পো ব্যারাজ উদ্দেশ্যের দিক থেকে তুলনীয় নয়। ভারতের সাথে আমাদের যেরকম ঐতিহাসিক বিরোধ আছে, চীনের সাথে তা নেই। তাই চীনের সাথে একটা পানি চুক্তি অনেক সহজেই হতে পারে। অবশ্য চীনের সাথে ভারতের আছে চরম বিরোধ।
ব্রহ্মপুত্র নদ তিব্বত থেকে সরাসরি বাংলাদেশে বয়ে আসছে না, বয়ে আসছে ভারতের মধ্য দিয়ে। তাই এই নদীর পানি বিরোধ নিষ্পন্ন হলে লাগবে তিনটি দেশের সম্মতি। এই সম্মতির ব্যাপারটা নিতে পারে জটিল রূপ। ফারাক্কা ব্যারাজ যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, তাতে তার কার্যকারিতা আর থাকছে বলে আমার মনে হয় না। কেননা, গঙ্গা নদী এখন মুর্শিদাবাদের দিকে না ভেঙে, ভাঙছে উত্তরে মালদহের দিকে। অর্থাৎ গঙ্গা নদীর নতুন খাত সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। গঙ্গা নদীর প্রবাহ বিশেষভাবেই বদলে যেতে চলেছে।

ভারতে যা গঙ্গা নদী, বাংলাদেশে তার নাম হয়েছে পদ্মা। গঙ্গা নদী ফারাক্কা ব্যারাজের উত্তরভাগ ঘুরে এসে যুক্ত হতে চাচ্ছে পদ্মা নদীর সাথে। নদীর ঢাল যে দিকে থাকে, নদীর পানি সেদিকেই গড়ায়। স্বাভাবিকভাবেই গঙ্গার পানি তাই গড়িয়ে আসবে বাংলাদেশের মধ্যে। এরকমই আমার ধারণা। ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হয় জিয়া যখন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন মোরারজি দেশাই। মোরারজি দেশাইয়ের পানিসম্পদমন্ত্রী ছিলেন অটলবিহারি বাজপেয়ী। বাজপেয়ী আমাদের যথেষ্ট পানি দিয়েছিলেন। কিন্তু মোরারজি দেশাইয়ের মন্ত্রিসভার পতন ঘটে। ক্ষমতায় আবার আসেন ইন্দিরাগান্ধী। তিনি আমাদের পানি দিতে চান না। এরপর আবার ইন্দিরা সরকারের পতন হয়। দেবগৌড়া হন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর দেবগৌড়া প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় গঙ্গার পানি বণ্টন-চুক্তি। এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পেছনে ছিল পশ্চিমবঙ্গের তখনকার মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসুর আন্তরিক প্রচেষ্টা। আমরা অবশ্য এখনও বাস্তবে প্রতি বছর শুকনো মওসুমে (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে) চুক্তি অনুসারে পানি পাচ্ছি না। কিন্তু এই চুক্তির ফলে একটি লাভ হয়েছে, তা হলো ভারত নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছে যে, গঙ্গা নদীর পানির ওপর বাংলাদেশেরও অধিকার আছে।

ভারতের সাথে নতুন করে পানি বিরোধ দেখা দিয়েছে তিস্তার পানি নিয়ে। তিস্তা নদীর উদ্ভব হয়েছে সিকিমে। সেখান থেকে তা বয়ে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে। সেখান থেকে সে বয়ে এসেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে এটি বয়ে এসে পড়ছে বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্রে। তিস্তা এক সময় এসে পড়ত পদ্মা নদীতে। কিন্তু ১৭৭৭ সালে প্রবল বন্যার সময় তিস্তা তার খাদ বদলায়। এসে তিস্তা পড়তে আরম্ভ করে ব্রহ্মপুত্রে। ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশে দু’ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এক ভাগকে বলে নতুন ব্রহ্মপুত্র বা যমুনা। আর অন্য ভাগকে বলা হয় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। যা প্রবাহিত হয়েছে ময়মনসিংহ শহরের মধ্য দিয়ে। এই ধারাকে বলা হয় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র।
ভারতের সাথে নদীর পানির বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে বরাক নদীর পানি নিয়ে। এই নদীর উদ্ভব হয়েছে নাগা-মণিপুর জলপ্রপাত থেকে। সিলেট বিভাগের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় বরাক নদী বিভক্ত হয়েছে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দু’টি শাখায়। পরে সুরমা ও কুশিয়ারা একত্র হয়ে ভৈরব বাজারের কাছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। নাম ধারণ করেছে মেঘনা। যমুনা ও পদ্মা নদী গোয়ালন্দের কাছে একত্র হয়ে পদ্মা নামে পরিচিত হয়েছে। এই পদ্মা ও মেঘনা একত্র হয়েছে চাঁদপুরের কাছে। এই একত্রিত ধারা মেঘনা নামে পরিচিত হয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে।

ভারত চাচ্ছে বরাক নদীর ওপর আড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে। কিন্তু এ রকম বাধ নির্মাণ করলে বাংলাদেশ আর আগের মতো বরাক নদীর পানি পাবে না। এ ক্ষেত্রেও তাই দেখা দিয়েছে একটা পানি বণ্টন চুক্তির প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ছিল একটা নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু সে আর আগের মতো নদীমাতৃক দেশ থাকছে না। তাকে এখন অধিক নির্ভরশীল হতে হবে বর্ষার বৃষ্টির পানির ওপর। বর্ষাকালে বাংলাদেশে যথেষ্ট বৃষ্টি হয়। এই বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে পানির অভাব পূরণে। সাধারণত মরুময় অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হয় বছরে ৫০ সেন্টিমিটারের কম। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো অংশেই বছরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এত কম নয়। বর্ষার পানি ধরে রেখে তাই পানির অভাব পূরণ করা সম্ভব। বাংলাদেশে শীতকালে বৃষ্টি হয় না। কিন্তু শীতকাল এ দেশে থাকে মধ্য অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগ পর্যন্ত। বাংলাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মওসুমি বাতাসের প্রভাবে যথেষ্ট বৃষ্টি হয়। দক্ষিণ-পশ্চিম মওসুমি বাতাসে বঙ্গপোসাগরীয় শাখা বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয়বাষ্প বহন করে আনে। যা জমে পরিণত হয় মেঘে। মেঘ থেকে হয় বৃষ্টি। মেঘ থেকে বৃষ্টি হওয়ার একটা কারণ হলো, জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস হিমালয় পর্বতমালায় ধাক্কা খেয়ে উপরে উঠতে থাকে। ফলে সহজে মেঘের উদ্ভব হয়। পাহাড় আছে বলেই এরকম বৃষ্টি হওয়া সম্ভব হয়। না হলে হতো না।

দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর ভাগের যে অংশে থর মরুভূমি অবস্থিত, সেখানে আড়াআড়ি পাহাড় নেই বলে জলীয়বাষ্পপূর্ণ বাতাস তাতে ধাক্কা খেয়ে উপরে উঠে মেঘে পরিণত হতে পারে না। এই অঞ্চল তাই বৃষ্টি বিরল অঞ্চল। বাংলাদেশের পরিস্থিতি এরকম হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশের উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা থাকছেই। যাতে মওসুমি বাতাস ধাক্কা খেয়ে উপরে উঠে মেঘ সৃষ্টি হবেই। হিমালয় পাহাড় পেরিয়ে মওসুমি বাতাস যখন তিব্বতে যায়, তখন তাতে জলীয়বাষ্প থাকে না বললেই হয়। তিব্বত তাই একটা বৃষ্টি-বিরল অঞ্চল ((Rain Shadow)। আমি প্রাথমিক ভূগোলের এসব কথা বলছি, কেননা অনেকেই বলছেন বাংলাদেশ ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে একটা মরুময় অঞ্চল। কিন্তু তার সম্ভাবনা নেই। ভৌগোলিক বাস্তবতার বিচারেই সেটা বলা যায়।

গত সংখ্যার সংশোধনী : গত লেখায় (১৯ মে ২০১৮) ভুলবশত ছাপা হয়েছে : ‘কার্ল মার্কস বলেছিলেন, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রথমে প্রবর্তিত হল বিলাতে।’ সেখানে আসলে হবে ‘কার্ল মার্কস বলেছিলেন, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রথমে প্রবর্তিত হবে বিলাতে।’

চিঠির উত্তর : নয়া দিগন্তের ২৩ মে ২০১৮ সংখ্যায় ফরিদ মুন্্শী, ঢাকা থেকে জানতে চেয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের জমিদারি পতিসরে একটি সমবায় কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন। এ সম্পর্কে আমি কিছু জানি কি না। আমি এই সম্পর্কে বিশদ কিছু জানি না। যা জানি তাও কতটা নির্ভরযোগ্য সেটা নিয়ে আমার নিজের মনেই সংশয় আছে। তাই এ বিষয়ে কিছু আলোচনা করা সমীচীন হবে বলে মনে করছি না। রবীন্দ্রনাথ পতিসরের জমিদারি লাভ করেছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর নওগাঁর কালিগ্রাম মৌজার জমিদারি কিনেন ১৮৩০ সালে। পতিসর কালীগ্রাম মৌজায় অবস্থিত একটি গ্রাম। রবীন্দ্রনাথ এই জমিদারি উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন। এ বিষয়ে যথাযথভাবে জানতে হলে পড়–ন সিদ্ধার্থ ঘোষ লিখিত প্রবন্ধ ‘প্রিন্স দ্বারকানাথ’ (দেশ, ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪, পৃষ্ঠা ২৫)।
শাহজাদপুর রবীন্দ্রনাথের জমিদারি নয়। শাহজাদপুর হলো অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারি। শিলাইদহ হলো গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারি। এরা যখন নাবালক ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তখন এই দুই জমিদারি এদের পক্ষ হয়ে দেখাশোনা করতেন। তাই ভুল ধারণা জন্মেছে যে, এ দুটিও ছিল রবীন্দ্রনাথের জমিদারি। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির জমিদারি ছিল বহু ভাগে বিভক্ত। এর ছিল অনেক শরিক। ১৮৬৩ সালে রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বোলপুর স্টেশনের কাছে জায়গা কিনে শান্তিনিকেতন আশ্রম স্থাপন করেন। রবীন্দ্রনাথ ১৯০১ সালে এখানে ‘ব্রহ্মাচার্যাশ্রম’ নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এতে কেবল হিন্দু ও ব্রাহ্মণ ছাত্ররাই পড়তে পারত। পরে রবীন্দ্রনাথ এখানে বিশ্বভারতী নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। রবীন্দ্রনাথ এই অর্থের জন্য সে সময়ের ভারতে বিভিন্ন দেশীয় রাজাদের কাছে চাঁদা চেয়ে পাঠান। কিন্তু কোনো দেশীয় রাজা চাঁদা দেন না, একমাত্র হায়দ্রাবাদের নিজাম ছাড়া। তিনি এক লাখ টাকা চাঁদা দেন। এক লাখ টাকা সে সময় ছিল একটা বড় রকমের অঙ্ক। এই চাঁদা পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীতে কিছু হাতেগোনা মুসলমান ছাত্রের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেন। এসব ছাত্রের মধ্যে বিশেষ খ্যাত হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। যা ছিল ব্রহ্মাচার্যাশ্রম, তাকে বলা হতে থাকে শান্তিনিকেতন। অর্থাৎ শান্তিনিকেতন হলো স্কুল আর বিশ্বভারতী হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে। এখন শান্তিনিকেতন অথবা বিশ্বভারতীতে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘বাংলাদেশ ভবন’। যা নিয়ে খুব সোরগোল করা হচ্ছে। বিশ্বভারতীয় লেখাপড়ার ব্যাপারে তেমন কোনো নামকরা প্রতিষ্ঠান নয়। বিশ্বভারতী খ্যাতি অর্জন করেছে চিত্রকলা, সঙ্গীত ও নৃত্যকলায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালের জুলাই মাসে। এই বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে খুবই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে ও করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলেই পূর্ববঙ্গের মুসলমান সমাজে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব সম্ভব হয়েছিল। যারা হলেন আজকের বাংলাদেশের উদ্ভবের ভিত্তিভূমি। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে পালন করেন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে তার মৃত্যুর পরে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বাংলাদেশের একদল বুদ্ধিজীবী বোঝাতে চাচ্ছেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, আসলে বিশ্বভারতীই হচ্ছে বাংলাদেশের সংস্কৃতির উৎসভূমি। আমি জনাব ফরিদ মুনশীর চিঠির উত্তরে এসব কথার অবতারণা করছি এ জন্য যে, রবীন্দ্রনাথ কেমন জমিদার ছিলেন, সেটা আর আমাদের আলোচ্য হওয়া উচিত নয়। আলোচ্য হওয়া উচিত রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাংলাদেশে যে বিশেষ রাজনীতি করা হচ্ছে, সেইটাই; যদি আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে চাই।

কোঠা পদ্ধতি ছাত্রলীগ কী ভূল পথে হাটছে?
                                  

মো: হারিস চৌধুরী:

 

হায়রে বাংলাদেশ! আজ যদি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন লজ্জায় মাথা লুকতেন কোথায় ? এই লজ্জা বঙ্গবন্ধুর ; এই লজ্জা সমগ্র বাঙ্গালী জাতির। ছাত্র রাজনীতির উদার পাঠশালা থেকে নেতৃত্বের গুনাবলি বিকাশিত করে একটি জাতিকে স্বাধীনতা উপহার দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। আর বর্তমানে ছাত্ররাজনীতি হয়ে উঠেছে কিছু বিবেক-বুদ্ধিহীন, চাটুকার, তেলবাজ, সন্ত্রসী, ধর্ষণকারী তৈরির কারখান। যেই রাজনীতি ছাত্রদের লাভ বুঝতে পারে না, ছাত্রদেও যৌকিক্ত আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় না, বরং সেই ছাত্র আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রের লাঠিয়াল বাহিনী কাজ করে, সেই রাজনীতি ছাত্রদের জন্য তো নয়ই, সর্বোপরি দেশের জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন করেছিলেন বেশির ভাগ মানুষ তাকে ভুল বুঝেছিলেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের অনেকেই না বুঝে বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা কখনোও বাকশালের মর্মার্থ বুজতে পারেনি এবং বাকশালের চেতনা দেশের মানুষের কাছে পৌছে দিতে পারেনি। যার মূল্য বঙ্গবন্ধু দিয়ে গেছেন জীবন দিয়ে। এমনকি বর্তমানেও বাকশালকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গালি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। বেশির ভাগ আওয়ামী লীগের ভায়েরা তো এরিয়ে যান অথবা কুতর্কে জড়িয়ে পরেন। আজ ছাত্রলীগের মেধা -মননের চর্চা না থাকায় আওয়ামী লীগ কে বার বার লজ্জিত হতে হয়।
চীনের কিংবদন্তি নেতা মাও সে তুং ১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে আজ চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ, যাকে নিয়ে চীনা কমিউনিষ্ট পার্টি এবং সমগ্র চীন গর্ব করে। অথচ একই উদ্দ্যেশে একই প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে তার জীবন উৎসর্গ করতে হল। আর আওয়ামী লীগ আজও বয়ে বেড়াচ্ছে বাকশালের অপবাদ। এই ব্যার্থতা কার ? অনেকের অনেক ধরনের উত্তর থাকতে পারে। কিন্ত আমি মনে করি এই ব্যর্থতা সম্পূর্ন রূপে ছাত্রলীগের , যারা তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য ভূলে আওয়ামী লীগের লেজুড় এবং সরকারের পেটুয়া বহিনীতে পরিণত হয়েছে। মেধার চর্চা না থাকলে ছাত্ররাজনীতি তার উদ্দেশ্য হাসিল ব্যর্থ হয় তা আমরা বাঙ্গালীরা ছারা কেই বা ভাল বুজবে? 
ছাত্রলীগের রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস, অথচ আজ ছাত্রলীগের বদনামের অন্ত নেই। কোটা পদ্ধতি সংষ্কারের মত একটি যৌকিক্ত ছাত্র আন্দোলন দমনে আজ ব্যবহৃত হচ্ছে ছাত্রলীগ।
ছাত্রলীগের  ভাইদের রাজপথের এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গত কয়েকদিনের কর্মকান্ডে জাতি বাকরুদ্ধ। বিশেষ করে লন্ডনে সেচ্ছা নির্বাসিত একজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতার অনলাইন কর্মকান্ড জাতিকে ব্যাথিত করেছে। তবে তাদের মনে রাখা উচিত ছাত্রদের বিরুদ্ধে গিয়ে ছাত্র রাজনীতি করা যায় না। আর ছাত্রলীগ যদি এই পথেই হাটে তবে তা আওয়ামীলীগের বোঝা ভারি করা ছাড়া কোন ইতিবাচক ফলাফল দিতে পারবে না। আওয়ামী লীগ বিরোধী নিন্দুকেরা একটা হাস্যকর প্রবাদের জন্ম দিয়েছিল বহু আগে “তুই মানুষ না, তুই আওয়ামী লীগ” আর এখন সমগ্র বাংলাদেশ বলে “তুই ছাত্র না, তুই ছাত্রলীগ”।
 
মো: হারিস চৌধুরী
সাবেক শিক্ষার্থী ও চাকুরীপ্রার্থী
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

১০/০৪/২০১৮/ডিটিভি বাংলা/মেহেদী হাসান

টিপটিপ বৃষ্টি এবং ওয়াসার এমডি
                                  

ওয়াসার মহামান্য এমডি ঢাকাবাসীর উদ্দেশে যে আশ্বাস বাণী উচ্চারণ করেছেন তাকে আশ্বাস বাণী না বলে সতর্কবার্তা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। তিনি বলেছেন, ঢাকায় টিপটিপ বৃষ্টি হলে পানি জমবে না। তা সে বৃষ্টি যদি টানা ১০ দিন ধরেও হয়। তবে ঘণ্টায় ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিকে কিছুটা সমীহ করে বলেছেন, ‘একটু জলজট হতে পারে’। এই একটু জলজট বলতে কতটুকু বোঝায় তাও পরিষ্কার করেননি তিনি।

টিপটিপ বৃষ্টিপাতের কথা বলে যে মহাকাব্যিক ব্যাখ্যা এই ব্যবস্থাপক উপস্থাপন করেছেন, সম্ভবত বিষয়টি আজকের শিশুটিও জানে। তবে জানেন না ওয়াসার এমডি তাসকিম এ খান। আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতার কথা ভেবেই তিনি হয়তো টিপটিপ বৃষ্টির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ কথা স্মরণ না করিয়ে দেওয়াটাই বোধহয় শোভন ছিল। তবে শোভন-অশোভনের বাইরে তিনি বেশকিছু কঠিন ও বাস্তব কিছু চিত্র তুলে ধরেছেন, যা সত্যিকার অর্থেই প্রশংসার দাবি রাখে।

তিনি বলেছেন, একসময় ঢাকায় ৬৫টি খাল ছিল। এখন তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ভার। এখন মাত্র ২৬টি খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। যদি শহরের এই ৬৫টি খাল এবং শহর ঘিরে যে পাঁচটি নদী প্রবাহিত ছিল তা জীবিত থাকত, তাহলে যেকোনো অবস্থায় আজ আর জলজট নিয়ে এত দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো না। তিনি বলেছেন, খাল দখল হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তবে খাল দখলে ওয়াসার কেউই জড়িত নন। আর এটা কোনো চুনোপুঁটির কাজও নয়। যারা দখল করেছেন এবং করছেন তাদের হাত অনেক লম্বা। ক্ষমতাও অনেক।

রাজধানীর জলজট হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি জল সংরক্ষণের জন্য যে পরিমাণ জলাভূমির প্রয়োজন, তা নেই বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, রাজধানীতে জলজট নিরসনের জন্য প্রয়োজন ১২ শতাংশ জলাভূমি। সেখানে আমাদের হাতে এখন রয়েছে মাত্র ২ শতাংশ। যার অধিকাংশই চলে গেছে ভূমিদস্যুদের দখলে। এসব কারণে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন কিছুটা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ওয়াসার এমডির উল্লিখিত ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হয়ে বলতে চাই, আমরা ঢাকা মহানগরকে জলজটমুক্ত একটি শহর হিসেবেই দেখতে আগ্রহী। যা হারিয়েছি তা ভুলে গিয়ে, যা আছে তাই নিয়ে নতুন করে শুরু করতে চাই। যেটুকু আছে তা বাঁচাতে চাই। সেটুকু বাঁচাতে পারলে রাজধানীবাসীও রক্ষা পেতে পারে— এটাই তাদের প্রত্যাশা।

সুপেয় পানি সংকটে আমরা
                                  

প্রাণের উৎস পানি। এক ফোঁটা পানির কাছে তৃষ্ণার সময় সব খাবার অপ্রয়োজনীয়। পানির অস্তিত্ব খোঁজার জন্য বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বাইরে চাঁদ ও মঙ্গলে অভিযান চালাচ্ছে। কারণ, পানির সন্ধান পেলেই সেখানে প্রাণের খোঁজ মেলা সম্ভব। আবার পৃথিবীর পরবর্তী মানুষের বাসস্থান এসব গ্রহ হতে পারে, যদি সেখানে পানি পাওয়া যায়। আমাদের এই ভূমণ্ডলের বেশির ভাগ অংশই পানি হলেও খাওয়ার উপযোগী পানির পরিমাণ কম। সেই কম থেকে আরো কমে আসছে।

নিরাপদ পানির উৎসস্থল ক্রমেই আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে, যা আমাদের জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশ্বেরর অনেক বড় শহর আজ পানির তীব্র সংকটে ভুগছে। কয়েকটি শহর তো রীতিমতো পানিশূন্য হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছে। আমাদের তিলোত্তমা শহর ঢাকা সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে। গরমের সময় এ সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করে। ক্রমেই ঢাকার আশপাশের নদনদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়াতে এবং তার সাতে পানি সংরক্ষণের কোনো সুবিধাজনক উপায় না থাকায় গত কয়েক বছরে পানির স্তর নষ্ট হচ্ছে।

কোনো সুপেয় পানির অভাব তার পেছনে অপরাপর বেশ কিছু কারণ জড়িত রয়েছে। আমাদের জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যা বেড়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে নদীনালা ভরাট হচ্ছে। নদীনালা, খালবিল ভরাট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ পানির উৎস নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি দ্রুত জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে। কৃষিজমি ভরাট হয়ে গড়ে উঠছে শিল্প-কারখানা। এসব শিল্প-কারখানার বিষাক্ত পদার্থ নদীতে পড়ার ফলে দূষিত হচ্ছে পানি। তা ছাড়া বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য পানির জোগান দেওয়া কর্তৃপক্ষের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। পানির জন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিভেদ, উপমহাদেশীয় আন্তকলহ। বাংলাদেশের সথেঙ্গ ভারতের পানিবন্টন নিয়ে অমীমাংসিত ইস্যু বহুদিন ধরেই ঝুলন্ত রয়েছে। তাই প্রয়োজন পরে পানির সঠিক সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবহার।

সুপেয় পানি কাকে বলে এর সজ্ঞায় জানা যায়, পনিতে লবণাক্ততার মাত্রা ৫০০ পিপিএম বা এক মিলিয়নের পাঁচশত ভাগের চেয়ে কম থাকে তাকে সুপেয় পানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী গোটা বিশে^র সিংহভাগ মানুষের নিরাপদ পানি সুযোগ নেই। নিরাপদ পানির অভাবে বিশ্বে প্রতিদিন এক হাজার চারশ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। এর অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। সারা বিশ্বেই এই এক চিত্র। অথচ পানির অপচয় কমাতে পারলে এবং সুষ্ঠু বণ্টন করতে পারলে এই দরিদ্র্র শ্রেণির অনেকেই পানি থেকে বঞ্চিত হতে পারে না। আমাদের দেশে বৃষ্টি বা এ রকম উৎস থেকে যে পানি আসছে তার অধিকাংশই নষ্ট হচ্ছে। অর্থ্যাৎ তা মাটিতে ফিরে যেতে পারছে না। অধিকাংশ নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে পানির সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।

গেল পানি দিবসেও বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বিশ্বে যে পরিমাণ পানি রয়েছে তার মধ্যে মাত্র .০১৪ ভাগ খাবার পানি রয়েছে। পানি মানুষের জীবন-জীবিকা ও উন্নয়নের সব বিষয়ের অত্যাবশ্যক উপাদান। তাই পানির সঠিক হিসাব হওয়া উচিত। মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হলে পানির ন্যায্য হিসাব একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য সুপেয় পানি এবং মোট জনসংখ্যার অন্তত ৯০ শতাংশের জন্য পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধ পরিকর। বাংলাদশের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতিতে পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের কষিকাজ, শিল্প-কলকারখানা, মৎস্য চাষ, জলজ সম্পদের আরোহণ থেকে শুরু করে আমাদের ঐতিহ্য এর সঙ্গে জড়িত। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই পানির সংকটের ব্যাপারে সতর্ক করে আসছেন। আমাদের দেশে কেবল রাজধানী ঢাকা শহর নয় বরং প্রধান প্রধান বিভাগীয় শহরগুলোয়ও পানির তীব্র সংকট ঘনীভূত।

বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে প্রায় ৭৬ কোটিরও বেশি মানুষ। আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ ৯৩০ কোটি মানুষের মধ্যে ৭০০ কোটি মানুষ সুপেয় পানির সংকটে পড়বে। এখনই বিশ্বে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ পানি পায় না অথবা তাদের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছায় না। ইউনিসেফ এর আগে এক জরিপে বলেছিল, আমাদের দেশের প্রায় কোটি ৬০ লাখ জনগোষ্ঠী সুপেয় পানির সংকটে রয়েছে। সুপেয় পানির সুযোগ বঞ্চিত জনসংখ্যার দিক থেকে আমাদের দেশের অবস্থান সপ্তম।

এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছিল, বাংলাদেশের ৪৪ শতাংশ মানুষ খাওয়ার জন্য নিরাপদ পানি পায় না। আমাদের দেশের প্রায় এক হাজার তিন শ নদীর মধ্যে শুকিয়ে যাওয়ার কারণে ২১২টি নদীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আর্সেনিক ঝুঁকিতে ভুগছে কয়েক কোটি মানুষ। পানযোগ্য সুপেয় পানির চাহিদা ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় আামদের বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক। এর মধ্যে মিঠাপানির উৎস সৃষ্টি করা, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সুপেয় পানির প্লান্ট করা, দেশের সর্বত্র বৃষ্টির পানির সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, শহরের মতো গ্রামের মানুষের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা করা, দেশের খাল বিল ও জলাভূমিগুলো রক্ষা করতে হবে, পরিকল্পিতভাবে নগরায়ণ করতে হবে, সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এ ছাড়া দেশের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে পানির সঠিক ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে হবে।

উন্নয়নের অভিযাত্রায় পদ্মা সেতু
                                  

পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়। দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে এর বাস্তবায়নের কাজ। ইতোমধ্যেই এ সেতুর ৬০০ মিটার দৃশ্যমান হওয়ার পথে। চলছে চতুর্থ স্প্যান বসানোর প্রস্তুতি। সোনালি রঙের এই স্প্যানে গেন্ডিং মেশিন দিয়ে জোড়া লাগানো স্থানগুলো ফিনিশিং করা হচ্ছে। এ ছাড়া এই স্প্যানটি বহনের জন্য ৩৬০০ টন ওজন বহনের ক্ষমতার ভাসমান ক্রেনের জাহাজটিও বিশেষায়িত ওয়ার্কশপের জেডির অপর প্রান্তে নোঙর করা হয়েছে। রঙের কাজ শেষ হলেই ‘৭ই’ নম্বর স্প্যানটি বহন করে নিয়ে যাব ৪০ ও ৪১ নম্বর খুঁটিতে। এই খুঁটির ওপরই বসবে চতুর্থ স্প্যান। ৪১ নম্বর খুঁটিও স্প্যান বসানোর উপযোগী করা হচ্ছে। আর এর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হবে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর ৬০০ মিটার।

গতকাল প্রতিদিনের সংবাদে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইতোমধ্যে পদ্মা সেতুর ১৪টি খুঁটির ডিজাইনও সম্পন্ন হয়েছে। শিগগিরই এটি সেতু কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তর হবে বলে দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, সেতুর ৪১টি স্প্যানের কয়েকটি ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। দ্রুত সময়ে এসব স্প্যান স্থাপনের কাজ শুরু করা হবে। এই সেতু প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ বিশেষভাবে উপকৃত হবে।

বিশেষ করে ফরিদপুর, শরীয়তপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে শিল্পায়ন হবে। এতে ওই অঞ্চলের অনেক মানুষ রাজধানীর পরিবর্তে ওই অঞ্চলে গড়ে ওঠা শিল্প কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। এ ছাড়া এ সেতুর মাধ্যমে রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার যাতায়াত ব্যবস্থাও সুগম হবে। আমরা জানি এ সেতুর সঙ্গে ট্রেন লাইনও সংযোগ করা হবে। আর তার বাস্তবায়ন হলে খুবই কম সময়ে ঢাকা থেকে ওই অঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা হবে। বর্তমানে মংলা সমুদ্র বন্দরের অনেকটাই অব্যবহৃত পড়ে থাকে। পদ্মা সেতু চালু হলে মোংলা বন্দরের কর্মচাঞ্চল্য অনেক গুণ বেড়ে যাবে।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ার কথা ছিল বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে। কিন্তু এ সেতু নির্মাণে পরামর্শক নিয়োগ এবং প্রাকযোগ্যতা যাচাই নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক প্রকল্পটিতে অর্থায়ন স্থগিত করে। এরপর অনেকেরই আশঙ্কা ছিল এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।

তবে সব আশঙ্কা অমূলক প্রমাণ করে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্পের কাজ এখন দ্রুত এগিয়ে চলেছে। আমরা আশা করছি, যথাসময়েই এর কাজ শেষ হবে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে রেল ও সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

বিমানবন্দর নয় যেন মৃত্যুফাঁদ
                                  

ইউএস-বাংলা বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা বাংলাদেশ, নেপালসহ আজ বিশ্বব্যাপী আলোচিত ও সমালোচিত হচ্ছে। শোকাবহ করেছে সর্বস্তরের মানুষকে। শোক জানিয়েছে জাতিসংঘ, বাংলাদেশ, নেপাল, বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সংগঠন। ঢাকা থেকে কেবিন ক্রুসহ ৭১ জন যাত্রী নিয়ে নেপালের উদ্দেশে আকাশে উড়েছিল বিমানটি। একপক্ষের মতে, ১২ মার্চ দুপুর প্রায় ২টায় নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের কন্ট্রোল রুমের ভুল নির্দেশনা ও সিদ্ধান্তের কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। পাইলটসহ নিহত হন ৫১ জন।

হিমালয়কন্যা নেপালের এই ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে বিমান দুর্ঘটনাই প্রথম নয়। ভয়ংকর অতীত আজো ইতিহাসে সাক্ষী হয়ে আছে। এ যেন এক মৃত্যুফাঁদ। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর পাহাড়ের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই বিমানবন্দর বহু দুর্ঘটনার সাক্ষী। ১৯৫৬ সাল থেকে ১২ মার্চ ২০১৮ দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত মোট ১০টি বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। কন্ট্রোল রুমের ভুল নির্দেশনা ও বৈরী আবহাওয়া প্রায় সব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ত্রিভুবন এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরই পাইলটকেই দোষারোপ করেন।

৩১ জুলাই ১৯৯২ সালে থাই এয়ারওয়েজের একটি এয়ারবাস অবতরণ করার জন্য বিমানবন্দরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় একটি পাহাড়ে বিধ্বস্ত হয়। এতে ১১৩ জন যাত্রীর সবাই নিহত হন। একই বছর ২৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি এয়ারলাইনস বিধ্বস্ত হয়। এতে নিহত হন ১৬৭ জন। ৭ জুলাই ১৯৯৯ সালে লুফ?টহানজা কার্গো বোয়িং ৭২৭ আকাশে ওড়ার পাঁচ মিনিট পড়ে চম্পাদেবী পর্বতে বিধ্বস্ত হয়। ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সালে নিকন এয়ার ফ্লাইট ১২৮ পোখারা থেকে কাঠমান্ডু যাওয়ার সময় বিধ্বস্ত হয়। বিমানে থাকা ১০ যাত্রী এবং ৫ জন ক্রু সবাই নিহত হন।

২৮ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে সীতা এয়ার ফ্লাইটের বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৯ জন। ২০১৬ সালে নেপালের বিমান ভেঙে মৃত্যু হয় ১৮ জন যাত্রীর। ইউএস-বাংলা বিমান বিধ্বস্তের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সালে টারা এয়ারল্যান্স বিমান দুর্ঘটনায় ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

সর্বশেষ ১২ মার্চ বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান ইউএস কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন এয়ারপোর্টসংলগ্ন ফুটবল মাঠে বিধ্বস্ত হয়। কেবিন ক্রু, পাইলটসহ নিহত হন ৫১ জন। যার বেশির ভাগই বাংলাদেশি। ক্রমাগত বিমান দুর্ঘটনা নেপাল এয়ারলাইনসকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কন্ট্রোল রুমে থাকা কর্মকর্তাদের উদাসীনতা কিংবা সেখানকার আবহাওয়াগত সমস্যার কারণেই দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। নেপাল গণমাধ্যম এ দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণের জন্য কমিটি গঠন করেছে। শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে দেশটির সরকার।

আমরা নেপাল সরকারের প্রতি আহ্বান রেখে বলতে চাই, কেবল শোক ও দুঃখ প্রকাশের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে এয়ারপোর্টটির সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগী হওয়ার সময় এসেছে। বিশ্বের শোকার্ত মানুষের আর্তির দিকে তাকিয়ে নেপাল সরকার নিশ্চয়ই সে আর্তির প্রতি মনোযোগী হবেন—এটাই প্রত্যাশা।

পাললিক ভূমিতে এলো নক্ষত্র মানব
                                  

আজ সেই দিন। পাললিক ভূমিতে যেন নেমে এলো বসন্ত বাতাস। বাতাসের কণ্ঠে ছিল একতারে বেজে ওঠা বাউলের গান। যে গানে ছিল এক রাখালের কথা। রাখাল কী বলেছিল? জন্মলগ্নের প্রথম প্রহরে প্রথম চিৎকারেই বলেছিল, ‘জয় বাংলা’। যার অর্থ, বাংলা ভাষাভাষী বাঙালি জাতির জন্য একটি স্বাধীন দেশ, স্বাধীন রাষ্ট্র।

১৭ মার্চ। জাতির জীবনে এক অনন্য দিন। প্রতিটি দিনের মতো সাধারণ নয়। কিছুটা হলেও ব্যতিক্রম। কেননা, এই দিনেই জন্মেছিলেন বঙ্গবন্ধু। গোপালগঞ্জের এক অখ্যাত গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায়। তার জন্মের মধ্য দিয়ে টুঙ্গিপাড়া যেমন মর্যাদার মুকুট পরার সৌভাগ্য অর্জন করেছিল, দেশ ও জাতি সেই মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়া থেকে এক বিন্দুও পিছিয়ে ছিল না।

আমি এক মহামানবের কথা বলছি। আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কথা বলছি। আমি সেই অঙ্গুলি হেলনের কথা বলছি। দুর্বিনীত কণ্ঠস্বরের কথা বলছি। ‘ভায়েরা আমার’..., আমি আমার ৫৬ হাজার বর্গমাইলের রূপকারের কথা বলছি। গোপালগঞ্জের অখ্যাত গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া যে শিশুটি আজ বিশ্বনন্দিত, আমি সেই নন্দিত শিশুটির কথা বলছি, ভালোবাসার কথা বলছি, আমাদের অহংকারের কথা বলছি।

যে স্বপ্ন দেখতে জানে না, সে মৃতদের সঙ্গে বসবাস করে। শেখ মুজিব স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন। স্বপ্নবীজ বপনের কারিগর ছিলেন তিনি। তার স্বপ্নের শক্তিই গোটা জাতিকে একত্রিত করেছিল। আর একত্রিত করেছিল বলেই আজকের বাংলাদেশ সেই কারিগরের স্বপ্নের ফসল হয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে এক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছে। তার স্বপ্নে ভর করে নিরস্ত্র একটি জাতি অসামান্য ত্যাগের বিনিময়ে নিজেদের বিজয়কে ছিনিয়ে এনেছে।

কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, সময়টা ১৯৪৭। তখন তিনি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে। তিনি ও শরৎচন্দ্র বসু চান যুক্তবঙ্গ। তার স্বপ্ন ছিল বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র। কিন্তু মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের বিরোধিতায় তা হয়ে ওঠেনি। দিল্লি থেকে খালি হাতে ফিরে এলেন সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসু।

বঙ্গবন্ধু হতাশ হলেন। স্বপ্ন থেকে এক চুলও নড়লেন না। তার সেই লালিত স্বপ্নকে আরো কঠিনভাবে লালন করলেন তার চিন্তা ও চেতনায়। ফিরলেন ঢাকায়। নতুন করে, নতুন উদ্যোগে, নতুন একটি রাষ্ট্রে শুরু হলো তার নতুন কার্যক্রম। যার পরিণতিতে জন্ম নিল নতুন এক দেশ। বাংলাদেশ যার নাম।

নারী শ্রমিকের বাঁচা-মরা
                                  

তিন দিন ধরে মোমেনার বাড়িতে চুলায় আগুন ধরাতে দেয়নি তার স্বামী ডেকোরেটর দোকানের সহকারী রফিকউল্লাহ মিয়া। চুলায় আগুন না জ্বললেও মোমেনার ঘরে জ্বলছে বিবাদের আগুন। যে আগুনে পুড়ে যাচ্ছে বিবাহিত জীবনের তিন বছরের সব সুখস্মৃতি-অন্তরঙ্গ মুহূর্ত, ভালোলাগা হাসি-খুশির প্রহর। পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে আগামী দিনের সাজানো স্বপ্ন এবং আশা। দরিদ্র ঘরের মেয়ে মোমেনা ক্লাস ফোর পর্যন্ত স্কুলে যাওয়া-আসা করেছিল। কিন্তু দরিদ্রতা তাকে আর স্কুলের আঙিনায় যেতে দেয়নি। কিশোরী বয়সের আভা অবয়বে প্রকাশিত হওয়ার আগেই মাত্র ষোলো বছর বয়সে, চাপকল মিস্ত্রি বাবা আতর আলী অনেক শখ করে পাশের গুনাইঘর গ্রামের জসিম খলিফার বড় ছেলে রফিকের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন মেয়ে খেয়ে-পরে সুখেই থাকবে। বিয়ের বছর রফিকের সঙ্গে মোমেনার যাপিত-জীবন কাটছিল মোটামুটি ভালোই। অর্থের টানাটানি থাকলেও উপোস করতে হয়নি তাকে কোনোদিন। এরই মধ্যে সংসারের স্বচ্ছলতা আনতে মোমেনা গ্রামের দু-চারজন বউ-ঝিদের পরামর্শে কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার অন্দরে পাওয়ার লুম কারখানায় কাজ নেয়। এমন কাজের বিনিময়ে মজুরি খুব একটা কম নয়। মোমেনার এমন কাজে স্বামী রফিকউল্লাহ মিয়ার অসম্মতি থাকলেও পরে নিষেধ করেনি। সে-ও প্রতিদিন তাকে মিলে পৌঁছে দিত। আবার কাজ শেষে দুজনে মিলে বাড়ি ফিরত।

বিয়ের তিন বছর অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর মোমেনার কোলজুড়ে কেউ না আসতে দেখে তার বিধবা শাশুড়ি সময়-অসময়ে তাকে জ্বালাতন করতেন। কখনো স্বামীর সামনে কখনো একা পেয়ে বকাঝকা করতেন। তা ছাড়া শাশুড়ির আকাঙ্ক্ষার শেষ ছিল না। কবে তার নাতি আসবে সে তাকে কোলে নিয়ে সারাগ্রাম ঘুরে বেড়াবে। আদর-যত্নে ভরিয়ে রাখবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এতদিনে নাতির আগমনের কোনো সু-সংবাদ না পাওয়াতে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। ছেলেকে বলে-কয়ে কবিরাজ-তাবিজ-কবচ ইত্যাদি করিয়েছেন অনেক। কিন্তু কোনো ফল না পেয়ে ছেলেকে শত অনুরোধ করে মোমেনাকে নিয়ে শহরে ডাক্তার দেখায়। ডাক্তার অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান দিয়েছেন মোমেনার মা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দীর্ঘদিন পাওয়ার লুম মিলে কাজ করতে করতে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রভাবে তার প্রজনন ক্ষমতাটি নষ্ট হয়ে গেছে। ডাক্তারের এমন কথায় মোমেনার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। সেই মুহূর্তে পাগলের মতো হয়ে ওঠে সে। তার কাজের সাথিরা তাকে সেই মুহূর্তে আশ্বস্ত করে। বাড়িতে এসে রফিকউল্লাহ মিয়া পাওয়ার লুমে কাজ করার অসম্মতির কথা তুলে তাকে রীতিমতো আক্রমণ করে বসেন। সন্তান না হওয়ার জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করে সাত দিনের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেন। সময়মতো গ্রামের মেম্বারের মাধ্যমে তালাকনামা পাঠিয়ে দেওয়ার কথাও জানান। কী করবে এখন মোমেনা? চলে যাবে রফিকের সংসার ছেড়ে? এসব কিছুরই উত্তর খুঁজে পায় না সে।

সভ্যতার অগ্রগতিতে মানুষ বিজ্ঞানকে তার উন্নতির সোপান তৈরিতে কাজে সাধিত করেছে। আর সুযোগ বুঝে বিজ্ঞান ও সভ্যতার সর্বাঙ্গে ছড়িয়েছে বিষাক্ত থাবা। তাই আজ মা ও শিশু সর্বদাই পরিবেশ দূষণে জর্জরিত। সারা বিশ্বে বর্তমান সময়ে বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা মায়ের ও প্রসূতি মায়ের যত্নের প্রচুর উন্নতি হয়েছে। উন্নতকামী দেশগুলো সব সুযোগ নেওয়ার জন্য মরণপণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। গত শতাব্দীর দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, বিশ্বে পরিবেশ দূষণই হচ্ছে প্রধান বিষয়। শিল্পায়নের যুগে বিপ্লব ঘটাতে গিয়ে কল-কারখানায় বিষাক্ত রাসায়নিকদ্রব্য বা উপকরণ মার্কারি, সিসা, পারদ, রাসায়নিক জৈব, আর্সেনিক ইত্যাদি ব্যাপক ব্যবহারের ফলে আজ পরিবেশ দূষণের মাত্রা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। যেকোনো শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকদ্রব্য প্রজনন ক্ষমতার ওপর কমবেশি প্রভাব ফেলে। ফলে অন্তঃসত্ত্বা নারী যারা কারখানাতে কাজ করেন তাদের সন্তানের জন্মগত ত্রুটি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বেঁচে থাকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কিশোরী থেকে শুরু করে যুবতী নারীরা বিভিন্ন ধরনের মিল-কারখানায় কাজ করছে। পরিবারের দরিদ্রতা লাঘবে প্রচেষ্টায় তারা জড়িয়ে পড়ছে মিল-কারখানার ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। সারা দেশে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ শ্রমিক কাজ করছে বিদ্যুৎচালিত তাঁত (পাওয়ার লুম) কারখানায়। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৫ থেকে ৭ লাখ। তবে তাদের মধ্যে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীর সংখ্যাই বেশি। তাদের অধিকাংশই হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা নারী শ্রমিক তাদের প্রতিদিনের আয়ের ওপর খাবার নির্বাহ হয়। পাওয়ার লুমে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ, প্রচ- দাবদহে দিনের পর দিন এই নারী শ্রমিকরা কাজ করেন। বিশেষ করে বছরের পর বছর পাওয়ার লুমের ডাস্টে অবস্থান করার ফলে তাদের অনেকের প্রজনন ক্ষমতা বিনষ্ট হয়ে বন্ধ্যা হওয়ার ঝুঁকি শতভাগ। তা ছাড়া নানা অসুখ-ফুসফুসে ক্যানসার, কিডনি, লিভারসহ দেহের বিভিন্ন অঙ্গে জটিল ব্যাধি আক্রমণ করতে পারে এবং এসব ফিজিক্যাল ফ্যাক্টর মাতৃত্বের আঘাত হানে। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান ডা. এ এফ এম জাফরউল্লাহ সরকারের মতে, ‘মিল-কারখানার তাপমাত্রা, কম অক্সিজেন, শব্দদূষণ ইত্যাদির জন্য দায়ী। হাই-অলটিটিউডে বিশুদ্ধ বাতাস পাওয়া গেলে তাতে অক্সিজেনের পরিমাণ কম, ফলে কম ওজনের শিশু জন্মায় কিংবা মায়ের গর্ভে শিশু পরিপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পায় না। তা ছাড়া তাপমাত্রা অধিক হলে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তা ছাড়া ক্রনিক ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, হাঁপানি ও ফুসফুসে পানি জমে পরে ক্যানসারের আশঙ্কাকে ঘনীভূত করে।’

দেশের অনেক এলাকায় বিশেষ করে বিদ্যুৎচালিত তাঁত মিলের নারী শ্রমিকদের কাছ থেকে জানা যায়, বিয়ের পর একজন নারীর সবচেয়ে বড় সাফল্য এবং স্বপ্ন সন্তানের মা হওয়া। কিন্তু বিয়ের পর তাদের অনেকেই সন্তান ধারণ করতে পারেননি। যার কারণে তাদের দাম্পত্যজীবন বিবাদ, নানা সমস্যা ও প্রতিকূলতা সৃষ্টি করছে। তবে অনেক নারী শ্রমিক এই পরিবেশে কাজ করতে করতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের রোগ-ব্যাধিতে ভুগছে। বেশির ভাগ নারী শ্রমিকই রোগগ্রস্ত। এমনকি তাদের সন্তানরাও রক্ষা পাচ্ছে না।

বিশ্বে কিছু দেশে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন কল-কারখানা ও মিল ফ্যাক্টরিগুলোয় সব ধরনের মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে—এমন সব দ্রব্য ও উপকরণের ব্যবহারের সতর্কতা অবলম্বন শুরু করা হচ্ছে। দেশগুলোর মধ্যে সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস এবং কানাডা অগ্রগামী অবস্থানে আছে। তা ছাড়া ইন্দোনেশিয়ান সরকার ইকোলোজিক্যাল গবেষণা ও কর্মসূচিতে ব্যাপক অর্থব্যয়ের মাধ্যমে এসব দূষণ ও প্রভাব বিস্তারকে ৬৫ শতাংশ সতর্ক পর্যায় নিয়ে তাদের কল-কারখানায় উৎপাদনের হার ১২ শতাংশ বাড়িয়েছে। সুতরাং এ বিষয়ে আমাদেরও পিছিয়ে থাকার অবকাশ নেই। অতি দ্রুত নীতিনির্ধারণী মহল মিল-ফ্যাক্টরি ও কল-কারখানায় নারী শ্রমিকদের কাজ করার বিপজ্জনক অবস্থা থেকে সতর্কতা ও সীমাবদ্ধতা স্থির করা। তা না হলে মোমেনার মতো আরো অনেক নারীর জীবনে ঘটে যাবে দুর্ঘটনা এবং বয়ে আনবে দুঃসংবাদ।

নির্যাতনের বৃত্তে গৃহকর্মী
                                  

গৃহপরিচারিকাদের ওপর নির্যাতন কোনো কোনো গৃহকর্ত্রী বা গৃহস্বামীর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তারাও যে মানুষ এ উপলব্ধিও হারিয়ে ফেলেছেন কেউ কেউ। বিশেষত শিশু গৃহপরিচারিকাদের ওপর নির্যাতন যেভাবে বাড়ছে তা আতঙ্কিত হওয়ার মতো। যৌন হয়রানির শিকার হওয়া তো নারী গৃহপরিচারিকাদের একাংশের জন্য নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এমনকি শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। যারা শিশুদের ওপর কথায় কথায় নির্যাতন চালায়, তাদের মানসিক সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে। নির্যাতন যেন তাদের কপালের লিখন। সামান্য ত্রুটি হলেই নির্যাতিত হতে হয়। তিনবেলা ভাত খেতে পাবে, শুধু এই আশায়ই সব নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। অথচ ওসব বাড়িতেই হয়তো একই বয়সী ছেলেমেয়ে আছে। এই গৃহকর্মীদের অনেকেরই ভালো বিছানায় ঘুমানোর অধিকার নেই। বাড়ির লোকদের সঙ্গে কথা বলা, টেলিভিশন সেটের সামনেও বসতে পারে না অনেকে। শিশু বয়সে যে কাজ করা সম্ভব নয়, এমন ভারী কাজও এসব শিশু গৃহকর্মীকে দিয়ে করানো হয়। ফলে তার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাটা বাধাগ্রস্ত হবে এবং তাদের অনেকেই পুষ্টিহীনতায় ভুগবে- এটাই স্বাভাবিক।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমন অসুস্থ মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। গৃহপরিচারিকা বিশেষত শিশু গৃহশ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রে কেউই পিছিয়ে থাকছেন না। সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে যারা জড়িত, তারাও জড়িত হচ্ছেন নির্যাতনের মতো বর্বরতার সঙ্গে। বাদ যাচ্ছেন না ক্রীড়া জগতের নন্দিত খেলোয়াড়রা। মুখে যারা মানবাধিকারের বুলি আওড়ান তাদের অনেকের ঘর শিশু নির্যাতনের আখড়া হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী দেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজার। এদের এক বড় অংশকে প্রতিনিয়তই নির্যাতনের শিকার হতে হয়। দেশে শিশু শ্রমিকদের সুরক্ষায় আইন না থাকায় নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধে তা ভ‚মিকা রাখতে পারছে না। কোনো কোনো নির্যাতনের ঘটনায় নির্যাতকদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও শেষ পর্যন্ত আপসের চোরাবালিতে তা ঢাকা পড়ে যায়। গরিব গৃহপরিচারিকা ও শিশুশ্রমিকদের অভিভাবকরা মামলা চালিয়ে আরো হয়রানি হওয়ার চেয়ে আপস করাকেই স্বস্তিদায়ক বলে মনে করেন। গৃহপরিচারিকা ও শিশু গৃহশ্রমিকদের নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধে কড়া আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার।

আইন করে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা হলে নির্মমভাবে এত শ্রমিককে প্রাণ দিতে হতো না। তাই অবিলম্বে আইন করে এ শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো যেতে পারে। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করেও বহু গৃহশ্রমিক নিস্তার পায় না। গৃহকর্তার কাছে অনেক গৃহশ্রমিক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। তার পরেও চাকরি হারানোর ভয়ে গৃহকর্তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারে না অনেক শ্রমিক।

আবার কোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। নেহাত পেটের দায়ে পরের বাড়িতে কাজ করতে আসা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক কর্মীরা গৃহকর্তা বা কর্ত্রীর বিচিত্র নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। শুধু আমাদের দেশের ভেতরেই নয়, আরব তথা গোটা মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক গৃহকর্মে নিয়োজিত রয়েছে। তাদের প্রায় আশি ভাগই নারী। তাদের মধ্যে অনেকেই নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও অত্যাচারের শিকার হচ্ছে। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী তাদের অধিকার রক্ষা করা হচ্ছে না।

অতএব বাংলাদেশ সরকারকে যেমনিভাবে দেশীয় গৃহপরিচারীকাদের স্বার্থরক্ষা, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও কল্যাণ সাধন করতে হবে, ঠিক একইভাবে প্রবাসী গৃহপরিচারীকাদেরও স্বার্থরক্ষা, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও কল্যাণ সাধনে রাখতে হবে বলিষ্ঠ ভ‚মিকা। বিশেষ করে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার স্বার্থে আমরা চাই তাদের আইনি সুরক্ষা। উল্লেখ করা যায়, গৃহকর্মে যারা সহায়তা করেন, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় তাদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তারা কোনো কৃতদাস বা দাসী নয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় গৃহকর্মী বা পরিচারিকাদের বেতনভুক্ত স্টাফের মর্যাদা দেওয়া হয়।

আমাদের বাংলাদেশে এখনো এক শ্রেণির শিক্ষিত বিবেকবান সচ্ছল গৃহস্থ বা সম্ভ্রান্ত পরিবার আছেন যারা বাড়িতে কাজের ছেলে বা মেয়ে রাখলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের চেয়ে খুব একটা পার্থক্য নির্ণয় করেন না। তবে এ দেশে অর্ধশিক্ষিত, বিবেকহীন, হঠাৎ গজিয়ে ওঠা নব্য ধনী ও মধ্যবিত্ত সংসারে গৃহকর্মীর ওপর বর্বর নির্যাতন অতিমাত্রায় দৃশ্যমান বিধায় এর সঙ্গে মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা কিংবা অনেকের অহংবোধের বিকারগ্রস্ততা থাকলেও থাকতে পারে। আবার পরিবার ও সমাজব্যবস্থা অন্য অনেক কিছুর মতো প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। এই ভাঙা-গড়ার ঘূর্ণাবর্তে এমন আরো অনেক সামাজিক সমস্যা দেখা দেওয়া অসম্ভব কিছু নয়। তবে আমাদের মতো দেশে গৃহশ্রমিকদের অবশ্যই আইনী সুরক্ষা দেওয়াটাই আজ সময়ের দাবি।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে যানজট
                                  

কোনো কিছুতেই নিয়ন্ত্রণের ভেতরে আনা যাচ্ছে না যানজট। নিরসনের জন্য আধা ডজনেরও বেশি ফ্লাইওভার নির্মাণ করে অনেকটা বোকার মতো তাকিয়ে থাকতে হয়েছে। যানজটের মাত্রা তো কমেইনি বরং বেড়েছে বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। পার্কিংয়ের নির্দিষ্ট স্থান করে দেওয়া এবং উল্টোপথে গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার পরও ঢাকা শহরে যানজট আগ্রাসী আকার ধারণ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়েছেন ২০১৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (এসটিপি) সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপর। বলেছেন, ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধিই রাজধানী শহরের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই স্রোতকে ঠেকানোই হবে যানজট নিরসনের অন্যতম প্রধান এবং প্রথম শর্ত। যার জন্য প্রয়োজন হবে ডিস্সেন্ট্রালাইজেশন তত্ত্ব।

রাজধানীতে পানের দোকানের মতো গজিয়ে উঠেছে এবং উঠছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ। যেগুলোকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিতে পারলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা সম্ভব হতো। প্রথমত, যানজটের আক্রমণ কিছুটা হলেও হাল্কা হওয়ার সুযোগ পেত। পাশাপাশি একটি বিশ্ববিদ্যালয় অথবা একটি মেডিক্যাল কলেজ জেলা অথবা উপজেলাকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেত।

শুধু মেডিকেল কলেজ অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, একসঙ্গে ঢাকা শহরে যেসব যানবাহন চলাচল করছে, তার অধিকাংশই ব্যক্তি মালিকানাধীন। বাস্তবতা বলছে, এ শহরে যত দিন পাবলিক সেক্টর অর্থাৎ সরকারি বাসের সংখ্যা বিশেষ করে দোতলা বাসের সংখ্যা শহরের চাহিদাকে পূরণ করতে না পারবে এবং প্রাইভেটকারের সংখ্যাকে কমানো না যাবে, ততদিন যানজটের বিষাক্ত নিঃশ্বাসে পুড়তে থাকবে প্রাচ্যের ভেনাস। সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে ফ্লাইওভার নির্মাণে সক্ষম হলে এক হাজার দ্বিতল বাস নামাতে সক্ষম হবে না কেন! যা ঢাকা শহরের যানজট কমানোসহ মানুষের বহুমুখী দুর্ভোগ নিরসনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তখন নিজের প্রয়োজন এবং সাচ্ছন্দ্যের প্রশ্নে মানুষ পাবলিক সেক্টরের যানবাহনকে আঁকড়ে ধরবে এবং অন্যান্য যানবাহনের লাভ কমতে থাকায় ক্রমান্বয়ে তা কমতে থাকবে।

মানুষ রিকশাকে আর বাহন হিসেবে গ্রহণ করবে না। রিকশাকে ঢাকা শহরের বাইরে নেওয়া গেলে রাজধানী তার হারানো গৌরবকে ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবে বলেই সবার বিশ্বাস। একইসঙ্গে গণপরিবহনের মধ্যে ট্রেনের সহজলভ্যকে আরও গতিশীল করাটাই এখন সময়ের দাবি। আমরা আশা করব, কর্তৃপক্ষ আমাদের এই পরামর্শকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

আইনের আওতায় কিন্ডারগার্টেন
                                  

মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়ে একসময় মানুষ লেখাপড়া করত। এমনকি কয়েক ইউনিয়ন মিলে একটি স্কুল থাকত আর দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসত। ভোরবেলা স্কুলের উদ্দেশে এলাকার সব ছেলেমেয়ে একসঙ্গে হেঁটে বাড়ি থেকে বের হতো, ঘণ্টা পড়ার ঠিক কিছুক্ষণ আগে স্কুলে গিয়ে উপস্থিত হতো। সময় পরিবর্তন হয়েছে, দেশ আধুনিকতার ছোঁয়ায় ভাসছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করছি আমরা। কুঁড়েঘর থেকে পাঁচতলা ভবনে বাস করছি এখন। বর্তমানে শুধু গল্প শুনি দাদাদের সময়ে নাকি গরুর গাড়ি করে জামাই বিয়ে করতে শ্বশুরবাড়ি যেত। আর এখন হেলিকপ্টারে করে জামাই শ্বশুরবাড়ি যায়। গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ থেকে সরাসরি যেমন আকাশ পথে উড়াল দিয়েছে, ঠিক তেমনই কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি করতে গিয়ে অতিরিক্ত হওয়ায় তা সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একসময় যেমন কয়েক ইউনিয়ন মিলে একটি স্কুল ছিল আর এখন মনে হয় প্রতি গজে গজে একটি স্কুল হয়েছে। যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো কিন্ডারগার্টেন গজিয়েছে। প্রতি পাড়া-মহল্লায় একাধিক স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত করার সরকারি কোনো আইনের তুয়াক্কা না করেই প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান। মার্কেটের ওপর, মহাসড়কের পাশে আবদ্ধ জায়গায় সম্পূর্ণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে এই কিন্ডারগার্টেনগুলো। অদক্ষ শিক্ষকমণ্ডলী দ্বারা পাঠদান করানো হচ্ছে। এই শিক্ষকদের অধিকাংশই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া। খুব সামান্য বেতনে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে তাদের। কিছুদিন পরপর শিক্ষক পরিবর্তন করাও এসব কিন্ডারগার্টেন মালিকদের কৌশল যাতে ওই শিক্ষকদের এক-দুই মাসের বেতন না দিতে হয়।

অল্প কয়েক দিন আগে আমাদের গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনায় একেবারে প্রধান সড়কঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত গাজীপুর শাহীন ক্যাডেট একাডেমি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষক চতুর্থ শ্রেণির কক্ষে শিক্ষার্থীরা উচ্চশব্দে জাতীয় সংগীত পাঠ করার অপরাধে শ্রেণিকক্ষে থাকা ২০ শিক্ষার্থীকে স্কেল দিয়ে বেদম প্রহার করে। এমনকি কয়েকজন মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে কেটে যায়। এ নিয়ে পুরো উপজেলায় হইচই পড়ে যায়। পরে অবশ্য ওই শিক্ষককে তাৎক্ষণিক বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওই শিক্ষককে শুধু বহিষ্কার করলেই কি এ সমস্যার সমাধান হবে? ওই ঘটনায় উপজেলা শিক্ষা অফিসারের প্রতিবেদনে জানা যায়, মাত্র ১৮ দিন হয়েছে অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের শিক্ষকতার বয়স। কোনো ধরনেরর পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ফলে কোমলমতি শিশুদের এ ধরনের নির্মম খেসারত দিতে হয়েছে। তা ছাড়া ওই স্কুলটি সরকারের শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা যে শুধু অমান্য করছে তা কিন্তু নয়, প্রধান সড়কের পাশে মার্কেটপ্লেসে গড়ে তুলেছে তাদের এ প্রতিষ্ঠান। স্কুলের মাঠ নেই যে শিশুরা একটু-আধটু ছোটাছুটি করবে। তাদের শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৫০০, শিক্ষক শতাধিক এবং অন্যান্য স্টাফ ও অভিভাবক মিলে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার লোকের প্রতি মূহূর্তেই গমনাগমন সেখানে। যেহেতু স্কুলের ভেতরে তেমন জায়গা নেই, সেহেতু স্কুল চলাকালে রাস্তায় অসহনীয় যানজটের সৃষ্টি হয়। সুতরাং শিক্ষাবোদ্ধাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা স্থানীয় প্রশাসন আইনের কোনো ধারায় এদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করার অনুমতি দিয়েছে?

কেউ কেউ খুব রস করে বলেন, এগুলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলা মোটেও উচিত না। বরং এগুলো হচ্ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। যেহেতু এসব কিন্ডারগার্টেন ব্যক্তি মালিকানাধীন, সেহেতু নিজেদের ইচ্ছেমতো শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন ও অন্যান্য ফি নির্ধারণ করে থাকে। এ ছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেখানে বছরে মাত্র দুটো পরীক্ষার আইন করেছে। সেখানে তারা প্রত্যেক মাসেই পরীক্ষার নামে একদিকে যেমন মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপে মেধানাশের সম্ভাবনাও তৈরি করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অজুহাতেই এসব কিন্ডারগার্টেনগুলো টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সম্প্রতি এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালকরা আরো একটি নতুন কৌশল অবলম্বন করছে, তা হলো ক্লাস পার্টির নামে জনপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা নিচ্ছে। একটি প্রতিষ্ঠানে যদি ২ হাজার শিক্ষার্থী হয়, তবে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে ভাবা যায়? কিন্তু ক্লাস পার্টিতে তার অর্ধেক টাকাও খরচ করা হয় না।

অনেকেই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে কথা বলে। তাদের ধারণা সরকারি স্কুলগুলোয় লেখাপড়া হয় না। প্রাইভেট স্কুল কিংবা কিন্ডারগার্টেনের সব শিক্ষার্থীই জিপিএ-৫ পায় আর সরকারি স্কুলে পায় না। এবার শুনেন এই কিন্ডারগার্টেনগুলো কীভাবে জাতীর মেধা গ্রাস করছে। তার শুধু একটি উদাহরণ দিয়েই লেখা শেষ করছি। এখন থেকে ঠিক ১৫-১৬ বছর আগেও কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের তেমন কোনো সাড়াশব্দ ছিল না। আর এখনকার চিত্র সবার জানা। এই যে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, কেন হচ্ছে আর কীভাবে হচ্ছে এবং এর পেছনেই বা কারা? এসব কিন্ডারগার্টেন যখন থেকে প্রতিষ্ঠা লাভ শুরু করল, ঠিক তখন থেকেই দেশে শুরু হলো প্রশ্ন ফাঁস। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান নামের এসব কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের নৈতিক বা আদর্শের শিক্ষাদান বাদ দিয়ে কীভাবে প্রতিষ্ঠানের রেজাল্ট ভালো করা যায় সেই নেশায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফলে প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে আগামী দিনের প্রজন্মকে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তাতে বিন্দু পরিমাণও সন্দেহ নেই। কোচিং বাণিজ্য ও প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে এই প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। সুতরাং সরকার বাহাদুরকে এখনই এসব কিন্ডারগার্টেন নামের ভূঁইফুর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাভিমূল টেনে ধরতে হবে। অন্যথায় জাতি অদূর ভবিষ্যতে মেধাশূন্য ভূমিতে রূপান্তরিত হবে।

ভালোকে ভালো বলুন
                                  

আমরা কেউ কারো ভালোকে ভালো বলতে শিখিনি। বিষয়টি যেন আজ আমাদের সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। কেন জানি এখান থেকে বেরিয়ে আসার কথা আমরা আর ভাবছি না। রক্তের মধ্যে ভাইরাস প্রবেশ করে আমাদের বোধের সবকিছুকেই তছনছ করে দিয়েছে।

আমরা ভালোকে ভালো বলতে ভুলে গেছি। ভুলে গেছি সুন্দরকে সুন্দর বলতে। আর এ কারণেই নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাজে সহায়ক হবে—এমন অনেক ভালো উদ্যোগ আলোর মুখ দেখছে না। একজনের নেওয়া পদক্ষেপ অন্যজন এসে গ্রহণ করছেন না। ফলে পুরনো চিন্তাচেতনার সংস্কৃতির মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে সবকিছুই।

অভিযোগ রয়েছে, সংস্কার কিংবা ইতিবাচক পদক্ষেপ যারাই নিয়েছেন স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তাদের দফতর কিংবা সংশ্লিষ্ট পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে। গত বছর এমন দুজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। একটি ইসি সচিবালয়ে, অন্যটি জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অণুবিভাগে। তবে এ ধরনের ঘটনা এ দেশে নতুন নয়, বিশেষ করে সরকারি কর্মক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে এই রেওয়াজ, যা আজকে অনেকটা কালচারে পরিণত হয়েছে।

ইসি অফিসে সংস্কার বা ব্যতিক্রমী কাজ করে প্রথমে বিশেষ ব্যক্তিটি বেশ বাহ্বা পেয়ে থাকেন। একটা পর্যায়ে পৌঁছানোর পর হঠাৎ একটি পক্ষ ওই ব্যক্তির নেওয়া ইতিবাচক কাজগুলোর সমালোচনা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলা হয়। কাজটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়ার পর কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগে উপর মহলকে ভুল বুঝিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট পদে নতুন ব্যক্তি এসে আগের জনের রেখে যাওয়া সব সংস্কার উদ্যোগ পরিত্যাগ করেন। অর্থাৎ কোনো ভালো কিংবা উন্নত মানসম্পন্ন কাজকে গ্রহণ না করে চিরায়ত অচল পদ্ধতিকে আঁকড়ে ধরে চলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এতে তাদের ব্যক্তিগত চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলেও প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের চাহিদা এবং আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যায়।

আমরা মনে করি, দেশ, জাতি ও প্রতিষ্ঠানের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে উপর মহলকে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যথায় যেকোনো সময় ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসে সমাজকে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা কখনই আমাদের কাম্য হতে পারে না।

প্রতিভা ও প্রতিভাবান
                                  

মানবজীবনের অসামান্যতা ও অসাধারণত্বকেই প্রতিভা হিসেবে ধরা হয়। অসামান্য উদ্ভাবনী শক্তি প্রতিভার প্রথম ও মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় মানুষের সৃষ্টিশীল কাজে, উদ্ভাবনী শক্তিতে, বিস্ময়কর আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। এমন কিছু জটিল সমস্যার সমাধান এমনভাবে দিয়ে যেটা সাধারণ কারো পক্ষে কষ্টসাধ্য ও কল্পনাতীত ব্যাপার। শিল্পে, সাহিত্যে, বিজ্ঞানে, খেলাধুলায় সর্বত্রই প্রতিভা তার বিশেষ দ্যুতিময় অস্তিত্ব দিয়ে সর্বস্তরের মানুষকে বিমুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে। প্রতিভা ইংরেজি Genius শব্দের প্রতিশব্দ। প্রতিভা মূলত একটা বিশেষ্য পদ। যার অর্থ হচ্ছে প্রজ্ঞা, প্রভা, দীপ্তি, উদ্ভাবনী শক্তি, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব। প্রতিভা শব্দটির পূূর্ব শব্দ হিসেবে ধরা হয় প্রতিবোধ বা প্রতিবোধন। যার অর্থ প্রকাশ বা জাগরণ।

অসাধারণ সৃজনীশক্তি, ব্যতিক্রমধর্মী বুদ্ধিমত্তাবিশিষ্ট গুণাবলি যার ভেতর পরিলক্ষিত হয় না আর যায় হোক তাকে প্রতিভাবান বলা চলে না। অন্তর্নিহিত ব্যতিক্রমধর্মী বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার সক্ষমতা, সৃজনশীলতা অথবা জন্মগত ও প্রকৃতিগতভাবে একে বাস্তবে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হন। যিনি এ গুণাবলির অধিকারী তিনি প্রতিভাবান হিসেবে চিহ্নিত। জনগণ পৃথক চিন্তাচেতনায় কোনো ব্যক্তির চাতুর্র্যতা, উপস্থিত ও তীক্ষè বুদ্ধিকে প্রতিভারূপে আখ্যায়িত করে থাকে। প্রতিভার বিজ্ঞানসম্মত কোনো ব্যাখ্যা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। প্রতিভা শব্দটিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। ব্যক্তিগতভাবে তিনি নির্দিষ্ট অনেকগুলো বিষয়ে দক্ষ অথবা শুধু একটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। কী কারণে প্রতিভা এবং দক্ষতা প্রদর্শিত হয় এ-সংক্রান্ত গবেষণা কর্মশৈশবেই রয়েছে। কিন্তু মনোবিজ্ঞানে ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে। মূলত প্রতিভার মূলে অলৌকিকত্ব, আবেগ, ইচ্ছা ও প্রেরণা যাই থাকুক না কেন সাধনা ছাড়া প্রতিভার বিন্দুমাত্র দাম নেই। কেননা প্রতিভা মানুষের ভেতর সুপ্ত অবস্থায় থাকে। আপনা-আপনি বের হয়ে আসে না বা প্রকাশ পায় না। এটাকে সাধনা ও কঠোর ত্যাগের মাধ্যমেই বের করে আনতে হয়। রুশ বিজ্ঞানী ইভান পাভলভ মনে করেন, সৃষ্টিশীলতার অপরিহার্য শর্ত হলো অসাধারণ ধৈর্য ও নিরন্তন সাধনা। প্রতিভাবান এই বিজ্ঞানী নিজেই তার এ কথার উদাহরণ। বিখ্যাত প্রকৃতি বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন তার যুগান্তকারী গ্রন্থ Origin of species লেখার জন্য বিশ বছর ধরে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। মহাকবি ফেরদৌসি ত্রিশ বছর ধরে রচনা করেছেন মহাকাব্য : শাহানামা। এগুলোর মানে এই নয় যে, এগুলো তিনারা শুধু তিনাদের প্রতিভার বলেই করেছেন। প্রতিভার সঙ্গে তিনাদের ভেতরে জাগ্রত ছিল এক অসাধারণ ধৈর্য ও নিরন্তন সাধনা। সপ্তদশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত ইংরেজি লেখক, কবি ও নাট্যকার জন ড্রাইডেন বলেছেন, প্রতিভা তৈরি করা সম্ভব নয় এটা জন্ম থেকেই আসে এবং নিখুঁত পরিচর্চার মাধ্যমে সেটাকে বের করে সভ্যতার মঙ্গলে লাগাতে হয়।

যেমন বহুমুখী প্রতিভাবান ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসেবে স্যার আইজাক নিউটন কিংবা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নাম আধুনিক সভ্যসমাজে সর্বজনস্বীকৃত। এ ছাড়া নিকোলা টেসলা, আলবার্ট আইনস্টাইন, স্টিফেন হকিং প্রমুখ ব্যক্তিগতও অত্যন্ত সুপরিচিত। আলবার্ট আইনস্টাইনকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতিভাবান ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি অনন্য সাধারণ গুণাবলির পাশাপাশি গণিতে অত্যন্ত সিদ্ধহস্তের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষত ভাষা বিষয়ে যথেষ্ট নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে পারেননি। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এবং জোহন ওল্ফগ্যাং ভন গ্যাটে প্রমুখ ব্যক্তিরাও অসাধারণ প্রতিভাশালী ছিলেন। তারা বিভিন্ন বিষয়ে যথেষ্ট পারঙ্গমতা প্রদর্শন ও সক্ষমতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রতিভা সাধারণত জন্মগত বৈশিষ্ট্য, যা শৈশবকালীন শিশুদের মধ্যে দেখা যায় যা তাকে প্রতিভাবান হিসেবে সমাজ কর্তৃক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। মেধা প্রতিভার সমমর্যাদাসম্পন্ন ও সমমানের অধিকারী নয়। মেধা একটি বিশেষ গুণাবলি ও দক্ষতাবিশেষ, যা দ্রুত আয়ত্ত কিংবা শেখার সক্ষমতা অর্জন করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি খুবই সৃজনশীলতার অধিকারী এবং অসম্ভব যেকোনো ধরনের কার্যসম্পাদন করতে পারেন যা কেউ, কখনো কল্পনাও করতে পারেন না মানুষ বিবেকবুদ্ধি-সম্পন্ন সবচেয়ে অনুকরণপ্রিয় জীব। কেননা মানুষের বুদ্ধিও চর্চা ও এর বিকাশ মানুষকে শ্রেষ্ঠ জীবের আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারে। সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানুষই একমাত্র বিবেকবুদ্ধি-সম্পন্ন। জ্ঞানানুশীলন, নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায় ও কঠোর সাধনা, পরিশ্রম ইত্যাদি প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রয়োজন। যে ব্যক্তি যত বেশি জ্ঞানচর্চা করবে, সাধনা করবে, নিরলস পরিশ্রম করতে যে তত বেশি তার প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারবে। প্রতিভা এমন জিনিসের নাম যাকে জাগ্রত করতে কঠোর সাধনা ও অনুশীলনের প্রয়োজন হয়। প্রতিভা ও সাধনা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিধাতা প্রদত্ত বিবেক, জ্ঞান, বুদ্ধি, শক্তি যথাযথ কাজে লাগাতে না পারলে যেমন জীবনে কিছুই করা যায় না। ঠিক একইভাবে প্রতিভার ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলে কোনো কিছুই আশা করা যায় না। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজের নানা রকম বিপর্যয় বিপ্লব, গণজাগরণ অভ্যুদয়, যুদ্ধ সবকিছুকে উপেক্ষা করেও প্রতিভা বিকাশের জন্য নিরঙ্কুশ সাধনা করেছেন। একজন মা যেমন তার ছোট্ট অবুঝ না জানা, না বোঝা শিশুকে অধিক আদর স্নেহে লালন পালন করে বড় করে তোলেন। ইতিহাস খুলে দেখেন এই পৃথিবীর সব প্রতিভাবান ব্যক্তিও ঠিক একইভাবে তার ভেতরের প্রতিভাকে লালন-পালন করে জাগ্রত রেখেছেন এবং একসময় নিজেকে একজন প্রতিভাবান হিসেবে পুরো বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। যত্ন না করলে প্রতিভার অপমৃত্যু ঘটে।

প্রতিভা একটা স্বতন্ত্র গুণের অস্তিত্বও স্বতন্ত্র। নিজের কাছে নিজেই প্রতিভাবান দাবি করলেই আপনাকে কেউই প্রতিভাবান বলে খ্যাত বা বিবেচনা করবেন না। আপনার প্রতিভার বলে আমাকে করে দেখাতে হবে নতুন কিছু। আপনি এখন ইতিহাস খুঁজে বেড়ালেও আপনার প্রতিভার যথাযথ প্রয়োগ দেখাতে পারলে তখন ইতিহাস আপনাকে খুঁজে নেবে। তার নিজের ভেতরে আপনাকে স্থান দেবে—এটাই নিয়ম।

অনেক বিজ্ঞানীই দাবি করেছেন প্রতিভা বলে কিছুই নেই। সবই অধ্যাবসায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। আসলেই এমনটা নয় বোধ হয়। কেননা এক আর এক এর যোগেই দুই হয়। তাই তো শুধু পরিশ্রম নয়। প্রতিভার প্রয়োজন রয়েছে। কেননা আপনি যদি কালি ফুরানো কলম দিয়ে সারা দিন কোনো খাতায় লিখে যান তাহলে দিন শেষে এমনটা হবে যে আপনার সমস্ত খাতা ঠিক আগের মতোই সাদা রয়েছে, লেখার কোনো চিহ্ন নেই। সবই পণ্ডশ্রম। এখানে কলমের কালিই হলো প্রতিভা। প্রতিভা সবার মধ্যে থাকে না। তাই তো প্রতিভার সন্ধান পেলে সেটার সঠিক পরিচর্যা করতে হয়। তার যথাযথ বিকাশের সুযোগ দিতে হয়। বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে হয়। তবেই প্রতিভা তার সম্পূর্ণ স্পৃহা নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে এবং সেই প্রতিভাই সম্ভাবনাময় প্রাচুর্যপূর্ণতা দান করে মানবজাতিকে কল্যাণের পথে নিয়ে যেতে পারবে।

এ কথা একদম খাঁটি যে, সমাজ ও সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যান প্রতিভাবানরাই। তারাই মূলত সময়ের বিবেক। তারা মানব মিছিলের অগ্রভাগে থাকেন। সাধারণ মানুষদের তারা অনুপ্রাণিত করেন। সাহসের জোগান দেন। সামাজিক দায়িত্ব বোধকে জাগ্রত করতে সহায়তা করেন। তাই তো আমাদের উচিত প্রতিভার সঠিক পরিচর্চা ও প্রতিভাবানদের সঠিক সম্মান প্রদর্শন করা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘যে দেশে গুণের কদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মায় না।’ তাই তো আমাদের গুণী ব্যক্তিদের যথাযথ সম্মান করতে হবে। গুণের পরিচর্চা করেই সে গুণকে পরিবর্ধন করতে হবে। প্রতিভার আলোয় আলোকিত করতে হবে সারা দেশ, সমাজ তথা পুরো বিশ্বকে।

মধ্যপ্রাচ্যে ওআইসির ভাবনা
                                  

আরব লিগের মতো জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করেছে ইসলামিক দেশগুলোর সহযোগী সংগঠন ওআইসির ইন্ডিপেন্ডেন্ট পারমানেন্ট হিউম্যান রাইটস কমিশন (আইপিএইচআরসি)। একইসঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন ঘোষণার কড়া নিন্দা জানিয়েছে। এমন বেপরোয়া সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও নিরাপত্তা কঠিন পরিণতিতে পড়বে বলে সতর্ক করেছে কমিশন।

এতে স্পষ্ট হয়েছে, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের যে সুযোগ আছে তাকে খর্ব করে দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকারে এ সিদ্ধান্তে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করেছে আইপিএইচআরসি। এ ক্ষেত্রে পূর্ব জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকৃতির এক সপ্তাহের মাথায় ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ওআইসির এক জরুরি সম্মেলন ডেকে তা প্রত্যাখ্যান করে জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলে বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একদিনের সম্মেলন শেষে এই স্বীকৃতির ঘোষণা দিয়েছেন। ওআইসির তরফে যেসব রাষ্ট্র এখনো ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়নি তাদের প্রতি অধিকৃত জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ইস্তাম্বুল সম্মেলনের ইশতেহারে আরো বলা হয়েছে, যেসব দেশ ট্রাম্পের ঘোষণাকে সমর্থন করবে সেসব দেশের বিরুদ্ধে ইসলামী দেশগুলো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং সম্পর্ক ছিন্ন করবে।

ট্রাম্পের ঘোষণাকে বাতিল এবং আইনগতভাবে অকার্যকর মন্তব্য করে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত আরব-ইসরায়েল শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত করবে এবং সেখানে চরমপন্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য ট্রাম্প প্রশাসন দায়ী হবে। সভাপতির ভাষণে ইসরায়েলকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলি দখলদারিত্ব অবসানে জাতিসংঘকে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন এরদোয়ান। ফিলিস্তিনের ভূমি জবরদখল করে ১৯৪৮ সালে গড়ে ওঠা ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় মুসলমানদের ঐতিহাসিক পবিত্র মসজিদ বায়তুল মোকাদ্দাসসহ পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়। সেই থেকে ইসরায়েল জেরুজালেমকে তার রাজধানী হিসেবে দাবি করে এলেও গত ৫০ বছরে বিশ্বের কোনো দেশ তার স্বীকৃতি দেয়নি। জেরুজালেম নগরীকে একই সঙ্গে মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে সম্প্রতি জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কোর এক ঘোষণায় পূর্ব জেরুজালেমের ওপর ইহুদিদের দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ফিলিস্তিনের ওপর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণের আগপর্যন্ত শত শত বছর ধরে জেরুজালেমে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিস্টান ও ইহুদিরা শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে আসছিল। ইঙ্গ-মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই সেখানে অশান্তি ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা হয়। আরব-ইসরায়েল সংঘাত বন্ধে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের নীতি অনুসরণ করে দুই দশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি শান্তি প্রক্রিয়ার মধ্যস্থতা করে আসছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে শান্তি প্রক্রিয়ায় মার্কিন ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

অবশেষে গত ৬ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি দিয়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রক্রিয়ায় কার্যত আনুষ্ঠানিক ইতি টেনেছেন ট্রাম্প। কারণ জেরুজালেমের অধিকার ছাড়া ফিলিস্তিনি ও মুসলমানদের কাছে আর কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। ট্রাম্পের ঘোষণার পর থেকেই জেরুজালেম ও আশপাশের এলাকাগুলোতে প্রতিবাদ, বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন ফিলিস্তিনের প্রতিবাদী মানুষ। সারা বিশ্বের মুসলমানরা সঙ্গে সঙ্গেই ফিলিস্তিনের সঙ্গে তাদের সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়েছে। একমাত্র ইসরায়েল ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পশ্চিমা মিত্র ট্রাম্পের ঘোষণাকে সমর্থন করেনি। রশিয়া, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানিসহ পশ্চিমা দেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবেই ট্রাম্পের ঘোষণার বিরোধিতা করে ট্রাম্পের ঘোষণার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে ওআইসি, আরব লিগসহ বিশ্বের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের অবস্থান পরিষ্কার হয়ে গেছে। বলা যেতে পারে, ট্রাম্পের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম প্রশ্নে বিশ্বসম্প্রদায় এবং ওআইসিভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এক ধরনের মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে।

এদিকে ট্রাম্পের ঘোষণার পর থেকেই প্রতিবাদী ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলা ও টার্গেটেড কিলিং শুরু হয়েছে। হামাস এবং হিজবুল্লাহসহ ফিলিস্তিনি ও লেবানিজ প্রতিরোধ আন্দোলনের পক্ষ থেকে নতুন গণজাগরণ বা ইন্তিফাদার ডাক দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে হামাস ও হিজবুল্লাহ নেতাদের সঙ্গে রাশিয়া, ইরান ও তুর্কি নেতাদের মধ্যে ফোনালাপ ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে। এ থেকে বোঝা যায়, ট্রাম্পের ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে আরেকটি রক্তক্ষয়ী সংঘাত উসকে দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ এবং বিশ্বনেতারা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে একটি কার্যকর পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হলে আরেকটি আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ বেধে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ফিলিস্তিনের প্রতিরোধযুদ্ধ পূর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। গত একদশকে তারা একাধিকবার ইসরায়েলি বাহিনীকে পর্যুদস্তু করতে সক্ষম হয়েছে। রাশিয়া, ইরান, তুরস্কের হস্তক্ষেপে সিরিয়া এবং ইরাকে পশ্চিমা মদদপুষ্ট দায়েশের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে মার্কিনিদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়েছে। এহেন বাস্তবতায় বিশ্বজনমত উপেক্ষা করে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করা বড় ধরনের বোকামি। তবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ফলেই এই প্রথমবারের মতো ওআইসিভুক্ত রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিন প্রশ্নে একটি দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত নিতে সমর্থ হলো। ইস্তাম্বুল ঘোষণা ফিলিস্তিন প্রশ্নে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে। শুধু ঘোষণা দিয়ে জেরুজালেম সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না। এ জন্য ওআইসি, আরব লিগ, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশ্বসম্প্রদায়কে ন্যায় ও শান্তির পক্ষে সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এ ঘোষণায় বৈষম্য, উগ্রপন্থা ও সহিংসতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। তা বিশ্বজুড়েও দেখা দিতে পারে।

এদিকে, জেরুজালেম ইস্যুতে আরব দেশগুলো বিশেষ করে সৌদি জোটের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু। তিনি বলেন, জেরুজালেম ইস্যুতে কিছু আরব দেশের প্রতিক্রিয়া খুবই দুর্বল। তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রের ভয়ে ভীত। উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ফিলিস্তিনি ভূখন্ড দখল করে প্রতিষ্ঠিত হয় বর্ণবাদী ইসরায়েলি রাষ্ট্রের। পশ্চিমা খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং একের পর এক তাদের বাসভূমি দখল করে যাচ্ছে ইসরায়েল। অপরদিকে আইপিএইচআরসি তার বিবৃতিতে বলেছে, জেরুজালেমকে বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম পবিত্র শহর হিসেবে দেখে থাকেন। তাদের কাছে এর মূল্য অপরিসীম। বারবার জেরুজালেমে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব ও দেয়াল নির্মাণকে প্রত্যাখ্যান করেছে ইউনেস্কো। এমন কিছু করলে তা হবে অবৈধ—এ ঘোষণাও দিয়েছে ইউনেস্কো। একই বিবৃতিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে ঘোষণা দিতে আহ্বান জানিয়েছে আইপিএইচআরসি। এক্ষেত্রে একটি টেকসই সমাধানের জন্য জেরুজালেম ইস্যুতে একটি আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আইপিএইচআরসি বলেছে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উচিত এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্যারান্টি নিশ্চিত করা যে, আল-আকসা মসজিদ ইসরায়েলিদের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখা হবে।

কে এদের রক্ষক ?
                                  

পুলিশ যদি হয়ে থাকে আমাদের রক্ষক, তাহলে ছিনতাইকারীদের রক্ষাকারী কে? একসঙ্গে বিপরীত মেরুর দুই পক্ষকে রক্ষা করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। কর্মটি অনৈতিকও বটে। বেশির ভাগ মানুষ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, পুলিশ আর সাধারণ মানুষের রক্ষকের ভূমিকায় নেই। তারা তাদের আগের অবস্থান পরিবর্তন করে এখন অনৈতিক ও অন্যায়কারীদের পক্ষ নিয়েছে। তবে এদের সংখ্যা কত তা সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব না হলেও সমাজে অনৈতিক ও অন্যায় কর্মকান্ডের ব্যাপকতা দেখে বলা যায়, তুলনামূলক বিচারে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এরা সংখ্যায় এখন অনেক বেশি এবং শক্তিশালী।

এমনই একটি অনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে ছিনতাই। রাজধানীতে যে কর্মটি এখন রকেটগতিতে ছুটছে। অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারীরা। পুলিশ প্রশাসনের অলৌকিক উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে টানা পার্টির দৌরাত্ম্য।

গত দুই মাসে রাজধানীর অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছিনতাইকারীদের গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হয়েছেন তিনজন এবং আহতের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের বাইরেও ছিনতাইয়ের ঘটনা আছে, যা সবসময়ই জানার বাইরে থেকে যায়। মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডে টানা পার্টির কবলে পড়ে মারা যান জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক ফরহাদ আলম। টিকাটুলিতে এক নারীকে ছিনতাইকারীর কবল থেকে বাঁচাতে গিয়ে খুন হন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আবু তালহা খন্দকার।

দুঃখজনক হলেও সত্য, কাউকে ছিনতাইকারীর হাত থেকে রক্ষার জন্য সাধারণ মানুষ এগিয়ে এলেও পুলিশকে এগিয়ে আসতে কখনো দেখা যায়নি। বরং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ছিনতাইকারীর গোপন অংশীদার হিসেবে কাজ করার। কারণ হিসেবে বলা হয়, ছিনতাই চলাকালীন পুলিশের অবস্থান কাছাকাছি হলেও তাদের কখনো ভুক্তভোগীর সাহায্যে এগিয়ে আসতে দেখা যায় না।

গত সোমবার ভোরে ছিনতাইকারী রিকশায় বসা মায়ের কোল থেকে ব্যাগ টানতে গিয়ে শিশুসন্তানকে মাটিতে আছড়ে ফেলে। ঘটনাস্থলেই শিশু আরাফাত মারা যায়। এ মৃত্যুর জন্য আমরা কাকে দায়ী করব? সম্ভবত কেউই এর দায় স্বীকার করবে না, অতীতেও করেনি। অথবা বলা যায়, আমাদের সমাজব্যবস্থায় পুলিশ এ দায় বহন করার মতো নৈতিকতা বোধে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারেনি। আর এখানেই আমাদের পুলিশের ব্যর্থতা। জাতি হিসেবে যা আমাদের কাছে লজ্জার। এ লজ্জা কাঁধে নিয়ে কতকাল চলতে হবে, তা আমরা জানি না। তবে এর থেকে আমরা মুক্তি চাই।


   Page 1 of 6
     উপ-সম্পাদকীয়
মাদক দমন যেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিধন না হয়
.............................................................................................
ভাসানীর ফারাক্কা মিছিল
.............................................................................................
কোঠা পদ্ধতি ছাত্রলীগ কী ভূল পথে হাটছে?
.............................................................................................
টিপটিপ বৃষ্টি এবং ওয়াসার এমডি
.............................................................................................
সুপেয় পানি সংকটে আমরা
.............................................................................................
উন্নয়নের অভিযাত্রায় পদ্মা সেতু
.............................................................................................
বিমানবন্দর নয় যেন মৃত্যুফাঁদ
.............................................................................................
পাললিক ভূমিতে এলো নক্ষত্র মানব
.............................................................................................
নারী শ্রমিকের বাঁচা-মরা
.............................................................................................
নির্যাতনের বৃত্তে গৃহকর্মী
.............................................................................................
নিয়ন্ত্রণের বাইরে যানজট
.............................................................................................
আইনের আওতায় কিন্ডারগার্টেন
.............................................................................................
ভালোকে ভালো বলুন
.............................................................................................
প্রতিভা ও প্রতিভাবান
.............................................................................................
মধ্যপ্রাচ্যে ওআইসির ভাবনা
.............................................................................................
কে এদের রক্ষক ?
.............................................................................................
কে এই সন্দেহভাজন হামলাকারী আকায়েদ
.............................................................................................
বেদনার নাম বৃদ্ধাশ্রম
.............................................................................................
ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে...
.............................................................................................
পরিবেশ ও ওষুধশিল্পের কথা
.............................................................................................
টিভি দেখা বনাম খেলাধুলা
.............................................................................................
সাম্প্রতিক ভাবনা | মুহম্মদ জাফর ইকবাল
.............................................................................................
শৃঙ্খলার বাড়ি কোথায়
.............................................................................................
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি
.............................................................................................
আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে
.............................................................................................
বোমার চেয়েও ভয়ংকর
.............................................................................................
স্বচ্ছ সুন্দর এক শান্তির সন্ধানে
.............................................................................................
বাল্যবিবাহ বনাম প্রতিরোধ ব্রিগেড
.............................................................................................
নতুন সমীকরণে দুই পরাশক্তি
.............................................................................................
রোহিঙ্গা সংকট ও নিষ্প্রভ পরাশক্তি
.............................................................................................
সৌদি আরবে কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে?
.............................................................................................
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা পরিস্থিতি কিছু প্রসঙ্গ কিছু অনুষঙ্গ
.............................................................................................
আইন আছে আইন নেই
.............................................................................................
কোনো এক ভাষকের গল্প
.............................................................................................
কঠিন সংকটে স্পেন
.............................................................................................
স্বজন না দুর্জন আমাদের ডাক্তার
.............................................................................................
স্বেচ্ছাসেবা ও সমাজ উন্নয়ন
.............................................................................................
মূল্যবোধের অবক্ষয়
.............................................................................................
জাতিসংঘ ব্যর্থ হলেও বাতিঘর
.............................................................................................
আশ্বাসেই বিশ্বাস
.............................................................................................
কোন পথে চলেছে সন্তান...
.............................................................................................
এশীয় আর্থিক সংকট ও বাংলাদেশের আর্থিক খাত
.............................................................................................
স্বার্থের শিকলে বন্দি চীন ও রাশিয়া
.............................................................................................
নারী ও শিশু পাচার
.............................................................................................
দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি হতে পারে
.............................................................................................
রাজনীতিতে সুবাতাস
.............................................................................................
পরমাণু ইস্যুতে ৬ জাতি চুক্তি
.............................................................................................
১২ লাখ মানুষ বসতি হারানোর ঝুঁকিতে!
.............................................................................................
সুস্থ ও সবলভাবে বাঁচার জন্য ডিম
.............................................................................................
অনিরাপদ মাতৃত্ব এবং...
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
সম্পাদক : জাকির এইচ. তালুকদার ,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এস এইচ শিবলী ,
    [সম্পাদক মন্ডলী ]
সম্পাদক কর্তৃক ২ আরকে মিশন রোড থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ০১৫৫৮০১১২৭৫, ই-মেইল:dailybortomandin@gmail.com
   All Right Reserved By www.dtvbangla.com Developed By: Dynamicsolution IT [01686797756]