গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ২২৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যে উঠে এসেছে। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মৃতদের অধিকাংশই হৃদরোগ বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মারা গেছে। মাদকাসক্ত বন্দিদের প্রত্যাহারজনিত জটিলতা, মানসিক চাপ এবং চিকিৎসক সংকটকেও মৃত্যুর পেছনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ।
বিভিন্ন সংগঠনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় ডিটিভি বাংলার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, ‘অধিকাংশ মৃত্যুই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট থেকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মাদকসেবী বন্দি যারা আসেন, তারা এখানে মাদক না পাওয়ার একটা বিষয় আছে। আর অনেকেই এখানকার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় ডিপ্রেশনে বা ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েন। এসব কারণে তারা “কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট” হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাছাড়া চিকিৎসক সংকটও আমাদের বড় সমস্যা ।’
মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) বলেছে, গেল দুই বছরে মারা যাওয়া ২২৭ জনের মধ্যে ৪০ জন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে মারা গেছেন ৩০ জন ।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) দলীয় পরিচয় না দিয়ে বলেছে, প্রায় একই সময়ে কারাবন্দি ১৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৪ জন কারাবন্দির মৃত্যু হয়েছে। এরপর ২০২৫ সালে ১০৭ জন এবং এ বছর জুন পর্যন্ত ৬১ জন মারা গেছেন ।
আসকের পরিসংখ্যানে আরও জানা গেছে, সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনে ৭ জন এবং একই সময় কারাগারে ২৪ জন মারা গেছেন। ২০২৫ সালে গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনে মারা যান ১১ জন এবং ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মারা যান ৪ জন ।
কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১৮৯ জন, ২০২৫ সালে ১৩৬ জন এবং এ বছর জুলাই পর্যন্ত ১৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালের আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ২৩২ জনে ।
পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা তদন্ত হয়ে থাকে উল্লেখ করে পুলিশ সদর দপ্তরের সহাকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আমরা “জিরো টলারেন্স”। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তদন্ত করে দেখা হয়। কারো কোনো গাফলতি থাকলে তার বা তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে ।’
বগুড়া কারাগারে থাকা পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু বেশ আলোচিত হয়েছিল। তাদের অধিকাংশই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে কারা কর্তৃপক্ষ সে সময় জানিয়েছিল।
গত সপ্তাহে কারাগারে বন্দি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মনির নামে এক যুবলীগ নেতার মৃত্যুর পেছনে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তোলে দলীয় নেতাকর্মীরা। তাদের ভাষ্য, মনিরের বিরুদ্ধে ডজন খানেক মামলা দেওয়া হয়। এক একটি মামলায় জামিন পেলেও আরেকটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে রাখা হয়। প্রায় ১৭ মাস ধরে তিনি কারাগারে ছিলেন এবং মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিলেন ।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়টির ব্যাপারে আমরা আশা করেছিলাম ৫ আগস্টের পর কমে আসবে, আমরা পরিত্রাণ পাব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এটা কমছে না এবং কমানোর ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না ।’
এমএসএফ প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান জানান, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাঁর মতে, অনেক ঘটনাই প্রকাশ পায় না বা জানা যায় না। ফলে যে সংখ্যা প্রকাশিত হয় হেফাজতে মৃত্যু তার চেয়ে বেশি ।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের ৬৮টি কারাগারে সবসময়ই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দী থাকে। কারা কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, কারাগারে চিকিৎসার ঘাটতি আছে ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারাগারে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বাইরে থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে আসা, কারাগারের পরিবেশ, ডাক্তার এবং সময়মতো চিকিৎসার সংকট উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি কারাগারে একজন মানসিক রোগের চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশের কোনো কারাগারে এখনো একজনও মানসিক চিকিৎসক নেই বলে জানায় কারা অধিদপ্তর ।