পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের দুই প্রতিষ্ঠান বিবিএস ক্যাবলস ও বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস (বিবিএস) পিএলসির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চরম অনিয়ম ও আইনি লঙ্ঘনের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন ও ফাইনান্সিয়াল নোটস বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক হিসাবমান অমান্য করা, শ্রমিক আইন লঙ্ঘন এবং পরিচালকদের ব্যক্তিস্বার্থে কোম্পানির তহবিল ব্যবহারের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি বাড়ছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মূলধন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন ২০২৪ শেষে কোম্পানির মোট ট্রেড রিসিভেবলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২১ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে ২৮ কোটি ৯১ লক্ষ টাকা গত ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ অনাদায়ী অবস্থায় পড়ে আছে। আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী অনাদায়ী বা ঝুঁকিপূর্ণ পাওনার বিপরীতে সঞ্চিতি রাখা বাধ্যতামূলক হলেও পরিচালনা পর্ষদ এর বিপরীতে কোনো অর্থ সংস্থান রাখেনি। যদি এই বকেয়ার বিপরীতে যথাযথ সঞ্চিতি রাখা হতো, তবে কোম্পানির প্রকাশিত নিট লোকসানের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যেত। মূলত কৃত্রিমভাবে আর্থিক চিত্র ইতিবাচক দেখাতে বা লোকসান কমিয়ে রাখতে এই সঞ্চিতি গোপন করা হয়েছে।
কোম্পানি যখন কার্যকরী মূলধনের সংকট ও চড়া সুদের ব্যাংক ঋণে জর্জরিত, ঠিক তখনই সাধারণ পরিচালকদের মালিকানাধীন নানা প্রতিষ্ঠানের কাছে মূল কোম্পানির বিপুল পরিমাণ পাওনা আটকে রাখা হয়েছে। বছর শেষে বিবিএস মেটালার্জিক, হেলিক্স ওয়ার ও বিবিএস ক্যাবলস ইউনিট-২ এর মতো স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ কোটি ৮ লক্ষ টাকা। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অর্জিত অর্থ ব্যাংকের চড়া সুদের ঋণ পরিশোধে ব্যবহার না করে পরিচালকরা তাঁদের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে ব্যবহার করছেন।
একই সঙ্গে শোরুম ও সেলস সেন্টারগুলোতে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে। ৩০ জুন ২০২৪ তারিখে কোম্পানির প্রধান কার্যালয় এবং ৮৪টি বিক্রয়কেন্দ্রে মোট ৫ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা অলস নগদ পড়ে ছিল। একদিকে কোম্পানি ৯ থেকে ১২ শতাংশ চড়া সুদে ব্যাংকের চলতি হিসাব ঋণ ব্যবহার করছে, অন্যদিকে প্রতিদিনের বিক্রয়লব্ধ অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে ফেলে রাখা হয়েছে। যা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বড় ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে।
পাশাপাশি অ-উৎপাদনশীল খাতে বিপুল অর্থ আটকে রাখার প্রমাণ মিলেছে। স্থাবর সম্পদ সম্পর্কিত প্রগতিশীল কাজ খাতে ২৩ কোটি ৫২ লক্ষ টাকা আটকে রাখা হয়েছে, যা কোনো নতুন কারখানা বা যন্ত্রপাতি কেনার কাজে ব্যবহৃত হয়নি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কেবল কর্পোরেট অফিসের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। ব্যবসায়িক ধসের সময় অ-উৎপাদনশীল খাতে ক্যাশ ফ্লো আটকে রাখা চরম অব্যবস্থাপনার সমতুল্য।
অডিট রিপোর্টে অডিটররা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে কোম্পানিটি শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ২৩৭ থেকে ৩২৭ অমান্য করেছে। কর্মীদের জন্য আইনানুযায়ী নির্ধারিত প্রভিডেন্ট ফান্ড চালু করা হয়নি। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে যে গ্র্যাচুয়িটি ফান্ড পরিচালিত হচ্ছে, তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে অনুমোদিত নয় এবং ফান্ডের কোনো পেশাদার মূল্যায়নও করা হয়নি। ফলে কর্মীদের ভবিষ্যৎ তহবিল নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বিগত অর্থবছরে কোম্পানিটি ১৩ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকা নিট লোকসান করেছে। তা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্ষদ ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। সঞ্চিত আয় ঋণাত্মক থাকা সত্ত্বেও লোকসানি বছরে লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানির মূলধন ভিত্তিকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। অন্যদিকে স্পন্সর ও পরিচালকদের হাতে থাকা ৬ কোটি ৩৭ লক্ষ শেয়ারের মধ্যে ১ কোটি ১৯ লক্ষ শেয়ার বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছে। ফলে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে কোম্পানির মালিকানা ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কোম্পানির বিক্রয় রাজস্বে ৪১ দশমিক ১০ শতাংশ ভয়াবহ ধস এবং পরিচালন ক্যাশ ফ্লো মারাত্মক হ্রাস পাওয়ার কারণে অডিটরগণ তাঁদের প্রতিবেদনে ব্যবসা অব্যাহত রাখার সক্ষমতাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে কোম্পানিটির উৎপাদন ও ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।