বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতার মধ্যেই সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতি গ্রহণ করেছে সরকার, যা আমদানি ব্যয় ও ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। এই নীতির ফলে সরকারি আমদানি বেড়ে যাওয়ায় ডলারের বিপুল চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ে ধীরগতি থাকায় বাজারে ডলারের যোগান সীমিত হয়ে পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে ডলার কেনা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সরকারের উন্নয়ন ব্যায় বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবেই আমদানি বাড়ে। আর আমদানি বাড়লে যন্ত্রপাতি, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য ক্রয়ের জন্য প্রয়োজন হয় বেশি ডলার। এর ফলে এলসি খোলার সংখ্যা বেড়ে যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ সৃষ্টি হয়। যদি রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) থেকে পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ না আসে, তবে এই চাপ মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হার—উভয়ের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি এলসি নিষ্পত্তির জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদা বর্তমানে অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় পৌঁছেছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি বাজার থেকে ডলার কেনা চালিয়ে যায়, তবে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে এবং বিনিময় হার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, মুক্ত ভাসমান বিনিময় হার ব্যবস্থায় আন্তঃব্যাংক স্পট মার্কেটে টাকার মান ক্রমাগত পতনের প্রেক্ষিতে গত বছরের ১৩ জুলাই থেকে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন বাজারের অতিরিক্ত অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কেনা হয়। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারি এলসি খোলার চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং অন্যদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা কমে যাওয়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে সংকুচিত হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কেনার বিষয়টি বিবেচনায় নেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারণ তা বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ চলতি বছরের ৪ জুন নিলামের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার কেনা হয়। এর মাধ্যমে গত বছরের জুলাই থেকে এ পর্যন্ত মোট ডলার কেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৪২ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র বলছে, গত জুন মাসে সরকার ২০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের আমদানি এলসি খুলেছে। আর চলতি জুলাই মাসেও একই পরিমাণ এলসি খোলার প্রস্তুতি রয়েছে, যা আগামী সপ্তাহগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ওপর চাপ আরও বাড়াতে পারে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সম্প্রতি সরকারি এলসি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এসব এলসি নিষ্পত্তির জন্য ব্যাংকগুলোকে যথেষ্ট ডলার মজুত রাখতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এখন বাজার থেকে ডলার কিনতে থাকে, তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষে সরকারি এলসির এই চাপ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নীতি যথোপযুক্ত, কারণ অল্প কয়েকটি ব্যাংকের পক্ষে এত বিপুল এলসির চাপ সামলানো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা। কিন্তু সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতির কারণে সরকারের আমদানিনির্ভর কর্মকাণ্ড আরও বাড়বে, যা রিজার্ভ ও বাজারের ওপর চাপ বাড়াবে। তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এই মুহূর্তে ডলার কেনা অব্যাহত রাখে, তবে বিনিময় হার আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, সরকারি আমদানি চাহিদা বাড়ায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাজারে ডলারের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৬০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সরকারি এলসি নিষ্পত্তি করতে হচ্ছে।