এহসানুল হক মিয়া, নগরকান্দা (প্রতিনিধি):
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে তালমা মোড় থেকে নগরকান্দা পৌর শহর হয়ে জয়বাংলা মোড় পর্যন্ত সড়কটি দুই লেনের মহাসড়কে উন্নীত করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি মহাসড়কে উন্নীত করা হলে নগরকান্দা একটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। পাশাপাশি উপজেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসার পাশাপাশি যোগাযোগের ক্ষেত্রে তৈরি হবে নতুন সম্ভাবনা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুরের অন্যতম জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় উপজেলা নগরকান্দা। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যও সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় সড়ক অবকাঠামোর অভাবে এ অঞ্চলের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তালমা মোড় থেকে নগরকান্দা বাজার হয়ে জয়বাংলা মোড় পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার সড়কটি দুই লেনে উন্নীত করা হলে রাজধানী ঢাকা, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলগামী যানবাহনের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
প্রস্তাবিত রুটটি চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ দূরপাল্লার যানবাহন এ পথে চলাচলের সুযোগ পাবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। এতে তালমা-ভাঙ্গা মহাসড়কের ওপর যানবাহনের চাপ কমার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলগামী যানবাহনের প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ সাশ্রয় হতে পারে। এতে সময় ও জ্বালানি—দুই ক্ষেত্রেই সাশ্রয় হবে।
গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, বরিশাল, খুলনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলগামী যানবাহন তালমা মোড় থেকে নগরকান্দা হয়ে জয়বাংলা মোড় দিয়ে মহাসড়কে উঠতে পারবে। অন্যদিকে ঢাকাগামী যানবাহন তালমা-ভাঙ্গা মহাসড়ক ব্যবহার করতে পারবে। এতে যানবাহনের চাপ ভাগ হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে নগরকান্দার প্রধান সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করলেও এর প্রস্থ, অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। ফলে যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং সময় অপচয়ের মতো সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি পাট, পেঁয়াজ, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ী ও কৃষকদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরা এ অঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না। সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে শিল্পায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য কম সময়ে ও কম খরচে দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। সড়ক যোগাযোগের উন্নতি হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প ও পর্যটনসহ বিভিন্ন খাত উপকৃত হবে। তাই নগরকান্দার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এ সড়কের আধুনিকায়ন জরুরি।
এলাকাবাসীর দাবি, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর দ্রুত সমীক্ষা পরিচালনা করে সড়কটি দুই লেনের মহাসড়কে উন্নীত করার উদ্যোগ নিক। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরকান্দার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার হওয়ার পাশাপাশি উপজেলার উন্নয়নের চিত্রও বদলে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, একই সঙ্গে নগরকান্দায় একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল স্থাপন করা হলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আরও সহজ হবে। পাশাপাশি কুমার নদ পার হয়ে একটি বাইপাস সড়কের মাধ্যমে পৌর শহরের বাইরে দিয়ে কলেজ রোডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা গেলে নগরকান্দা পৌর শহরকে যানজটমুক্ত রাখাও সম্ভব হবে।
নগরকান্দা বাজার ব্যবসায়ী মুন্সি জাহিদুল ইসলাম বলেন, “যোগাযোগব্যবস্থায় নগরকান্দা অনেক পিছিয়ে আছে। প্রধান সড়কটি দুই লেনের মহাসড়কে উন্নীত করা জরুরি। যাতায়াতব্যবস্থা ভালো হলে পণ্য পরিবহনের খরচ কমবে এবং দূরদূরান্ত থেকে মানুষ নগরকান্দায় আসবে। সর্বোপরি, বাণিজ্যিক অগ্রগতির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
নগরকান্দা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি সৈয়দ শাহিনুজ্জামান (শাহিন) বলেন, “তালমা থেকে নগরকান্দা বাজার হয়ে জয়বাংলা মোড় পর্যন্ত প্রধান সড়কটি প্রায় ৪০ বছর ধরে অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। এ পথে প্রায় দুই লাখ মানুষের যাতায়াত। সাধারণ মানুষের চলাচল সহজ করা এবং নগরকান্দাকে বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি দুই লেনে উন্নীত করার দাবি জানাই। ফরিদপুর-২ আসনের এমপি, মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমার আবেদন, সড়কটি দ্রুত দুই লেনে উন্নীত করা হোক।”
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “নগরকান্দা পাট উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। এখানে উৎপাদিত পাটসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য পরিবহনে প্রশস্ত সড়ক প্রয়োজন। এ সড়কটি দুই লেনের মহাসড়কে উন্নীত করা হলে তা নগরকান্দার সার্বিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
এবিষয়ে সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার বলেন, “তালমা থেকে নগরকান্দা হয়ে জয়বাংলা মোড় পর্যন্ত প্রধান সড়কটি দুই লেনে উন্নীত করার যে দাবি উঠেছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সড়কটির পুরো অংশ সড়ক বিভাগের অধীনে নয়। এর কিছু অংশ এলজিইডির অধীনে রয়েছে। ফলে পুরো কাজটি সড়ক বিভাগের একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।”
এদিকে ফরিদপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম বলেন, “এটি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী প্রস্তাব। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ দূরপাল্লার যানবাহন এ সড়ক ব্যবহারের সুযোগ পাবে। ফলে একদিকে তালমা-ভাঙ্গা মহাসড়কের ওপর যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, অন্যদিকে নগরকান্দা হয়ে চলাচল করলে দূরপাল্লার যাত্রায় প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ সাশ্রয় হবে।”