বাংলার আকাশে যখনই জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মুক্তচিন্তা ও জাতীয় জাগরণের কথা উচ্চারিত হয়, তখনই অবধারিতভাবে উচ্চারিত হয় একটি নাম—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই বিদ্যাপীঠ শুধু উচ্চশিক্ষার আলো ছড়ায়নি, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে, ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এবং স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তাই ১লা জুলাই শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা, জাগরণ ও অগ্রযাত্রার এক গৌরবময় মাইলফলক।
১৯২১ সালের ১ জুলাই, ব্রিটিশ শাসনামলে পূর্ববঙ্গের মানুষের উচ্চশিক্ষার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। মাত্র তিনটি অনুষদ, বারোটি বিভাগ, ষাটজন শিক্ষক এবং কয়েকশ শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠান আজ একটি আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় এটি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেই নয়, বরং একটি সভ্যতার ধারক ও বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে "প্রাচ্যের অক্সফোর্ড" বলা হয় কেবল তার স্থাপত্যিক সৌন্দর্য বা একাডেমিক উৎকর্ষের জন্য নয়; বরং জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধির বিকাশ এবং উদার মানবিক মূল্যবোধের চর্চার জন্য। এই ক্যাম্পাসে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য চিন্তাবিদ, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, বিচারপতি, রাষ্ট্রনায়ক ও প্রশাসক, যাঁরা দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের মর্যাদা সমুন্নত রেখেছেন।
একটি জাতির ইতিহাসে কিছু প্রতিষ্ঠান থাকে, যেগুলো শুধু শিক্ষা দেয় না; বরং জাতির বিবেক হিসেবে কাজ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরা সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক মুক্তির সংগ্রাম। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অসংখ্য ভাষাসৈনিকের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা বিশ্বদরবারে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের যে বৈশ্বিক স্বীকৃতি, তার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।
স্বাধীনতার ইতিহাসেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনন্য। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন 'অপারেশন সার্চলাইট' পরিচালনা করে, তখন তাদের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ তারা জানত, এই বিশ্ববিদ্যালয়ই বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। সেই রাতে জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল), রোকেয়া হল সংলগ্ন এলাকা এবং শিক্ষকদের বাসভবনে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। শহীদ হন অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. মনিরুজ্জামানসহ বহু গুণী শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। তাঁদের রক্তে রঞ্জিত এই ক্যাম্পাস আজও স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব কেবল রাজনৈতিক ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নয়; জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণার ক্ষেত্রেও এর অবদান অসামান্য। দেশের প্রথম সারির গবেষক, বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই সৃষ্টি। অর্থনীতি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, জীববিজ্ঞান, আইন, সমাজবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রকৌশল গবেষণায় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবদান জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
বাংলাদেশের প্রশাসন, বিচার বিভাগ, কূটনীতি, ব্যাংকিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আজ যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের একটি বড় অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ ও নৈতিক অবস্থান দেশের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মানেই শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠ নয়; এটি একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আবহ। টিএসসি, বটতলা, কার্জন হল, অপরাজেয় বাংলা, রাজু ভাস্কর্য, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা—এসব স্থাপনা কেবল ইট-পাথরের নির্মাণ নয়, বরং জাতীয় চেতনার প্রতীক। পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা, বইমেলা, বিতর্ক, নাটক, আবৃত্তি, সংগীত ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন এ ক্যাম্পাসকে একটি চলমান সংস্কৃতির রাজধানীতে পরিণত করেছে।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা সায়েন্স, রোবোটিক্স এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নতুন বাস্তবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও নিজেকে আরও আধুনিক ও গবেষণানির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে যেতে হলে গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উদ্ভাবনী শিক্ষা পদ্ধতি, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা জোরদার করা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল কর্মসংস্থানের জন্য সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জাতির চিন্তাশক্তি গঠনের কারখানা। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন এক জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত করতে হবে, যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, দেশপ্রেম এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় ঘটবে।
একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব এখনও শেষ হয়ে যায়নি। বর্তমান সময়ে যখন সমাজে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের নানা চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে, তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়কেই আবারও মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ ও মানবিকতার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে হবে।
১লা জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই সব মহান শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের, যাঁদের আত্মত্যাগ, শ্রম ও মেধায় গড়ে উঠেছে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি ভাষা আন্দোলনের শহীদদের, মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের এবং সেই সকল স্বপ্নদ্রষ্টাদের, যাঁরা বিশ্বাস করতেন—একটি শিক্ষিত জাতিই পারে একটি উন্নত রাষ্ট্র নির্মাণ করতে।
আজকের এই গৌরবোজ্জ্বল দিনে আমাদের প্রত্যাশা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণা ও উদ্ভাবনকেন্দ্র হিসেবে আরও বিকশিত হবে। এখান থেকে জন্ম নেবে নতুন নতুন জ্ঞান, প্রযুক্তি, নেতৃত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ, যা ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান করে তুলবে।
সৌরভে, গৌরবে, ঐতিহ্যে ও সংগ্রামের ইতিহাসে অনন্য এই প্রাণের বিদ্যাপীঠ আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। লাল-সবুজের পতাকার মতোই এর প্রতিটি ইট, প্রতিটি বৃক্ষ, প্রতিটি প্রাঙ্গণ বয়ে বেড়ায় বাঙালির গৌরবগাথা। তাই ১লা জুলাই এলে আমরা শুধু একটি প্রতিষ্ঠার দিন উদযাপন করি না; আমরা উদযাপন করি একটি জাতির জাগরণ, একটি সভ্যতার বিকাশ এবং একটি অদম্য স্বপ্নের অভিযাত্রা।
শুভ জন্মদিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের আলোকবর্তিকা হয়ে তুমি চিরকাল আলোকিত করো বাংলাদেশকে। তোমার সৌরভে উদ্ভাসিত হোক আগামী প্রজন্ম, তোমার গৌরবে সমৃদ্ধ হোক আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।
প্রকৌশলী নাজমুল হুদা মাসুদ: স্পেশাল ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ পুলিশ, অ্যালামনাই ও রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জয়েন্ট সেক্রেটারি, বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি