প্রকাশ :: ... | ... | ...

ফ্যাসিবাদের পতন, ন্যায়বিচারের পরীক্ষা: একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা


সংযুক্ত ছবি

আবু সাইদের ছবি, এ দৃশ্যই জুলাই বিপ্লবের মোড় গুড়িয়ে দেয় | ছবি: ফাইল ফটো

মোহাম্মদ মোশার্রাফ হোছাইন খানঃ স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পতনের পর যেকোনো সমাজকে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনই নয়, বরং এক গভীর রাজনৈতিক, দার্শনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাস পেরিয়ে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মূল চ্যালেঞ্জ হলো—অপরাধীদের আইনি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং একই সাথে রাজনৈতিক প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা এড়িয়ে ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করা। কারণ, ফ্যাসিবাদ কোনো একক ব্যক্তির অপরাধ নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত ব্যবস্থা, যা বিচার বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রকে ব্যবহার করে নাগরিক অধিকার হরণ করে। এমতাবস্থায়, বিচারে যদি সর্বজনগ্রাহ্যতা না থাকে, তবে ন্যায়বিচার কেবল 'বিজয়ীর প্রতিশোধে' (Victor's Justice) পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে নতুন কোনো স্বৈরাচারের জন্ম দিতে পারে। এই ঝুঁকি এড়িয়ে একটি টেকসই সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই প্রতিবেদনে জাতিসংঘের 'রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচার' (Transitional Justice Framework), আধুনিক রাষ্ট্রদর্শন এবং বৈশ্বিক সংবিধানবাদের আলোকে একটি সমন্বিত রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে। সত্য উদ্ঘাটন, সুনির্দিষ্ট আইনি বিচার, রাষ্ট্রীয় ভুক্তভোগীদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ স্বৈরাচার রোধে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—এই চার মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সমাজে একটি টেকসই ও প্রতিশোধমুক্ত গণতান্ত্রিক উত্তরণের বাস্তবমুখী পথনির্দেশ করাই এই নিবন্ধের মূল লক্ষ্য। 'স্টেট অব এক্সেপশন' ও 'ব্যানালিটি অব ইভিল'-এর রাজনৈতিক রাষ্ট্রদর্শন ফ্যাসিবাদ কীভাবে টিকে থাকে এবং পতনের পর কীভাবে 'আইনের স্বাভাবিকতা' ফিরিয়ে আনা যায়, তা অনুধাবনে রাষ্ট্রদর্শনের দুটি মৌলিক তত্ত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: জর্জিও আগামবেন ও 'স্টেট অব এক্সেপশন': ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেন দেখিয়েছেন, আধুনিক স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী আইনকে পুরোপুরি বাতিল করে না; বরং তারা "জরুরি অবস্থা" বা "জাতীয় নিরাপত্তা"র অজুহাত তৈরি করে আইনকে ঝুলিয়ে রাখে। তারা এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তোলে যেখানে আইনের মাধ্যমে স্বয়ং আইনকেই অকার্যকর করে রাখা হয় এবং নাগরিকদের আইনি সুরক্ষাহীন অস্তিত্বে রূপান্তর করা হয়। ফ্যাসিবাদের পতনের পর প্রাথমিক শর্ত হলো—আইনের এই অস্বাভাবিক ব্যবহারের ইতি টেনে 'আইনের স্বাভাবিকতা' (Legal Normality) ফিরিয়ে আনা। বিচারে কোনো প্রকার গুম, বিনাবিচারে আটক বা ঢালাও রাজনৈতিক মামলার পুনরাবৃত্তি ঘটলে তা আগামবেনের সেই ‘স্টেট অব এক্সেপশন’ বা আইনি অরাজকতাকেই দীর্ঘায়িত করবে। এর প্রতিকারে সংবিধানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ধারা ও মৌলিক অধিকার স্থগিত রাখার যে আইনি সুযোগ থাকে, তার ওপর কঠোর বিচার বিভাগীয় নজরদারি (Judicial Review) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। হান্নাহ আরেন্ট ও 'ব্যানালিটি অব ইভিল': রাজনৈতিক দার্শনিক হান্নাহ আরেন্ট দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রীয় অপরাধে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তিই চরম হিংস্র বা পৈশাচিক মানসিকতার হয় না। আমলাতন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য স্রেফ "আদেশ পালন" ও "চিন্তাহীন অন্ধ আনুগত্যের" (Thoughtlessness) কারণে ফ্যাসিবাদের যন্ত্রে পরিণত হয়। এটি 'কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি' (Command Responsibility) প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তিকে মজুত করে—যেখানে আদেশের দোহাই দিয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নকারীরা দায় এড়াতে পারেন না, আবার শীর্ষ নেতৃত্বও "আমি নিজে গিয়ে গুলি চালাইনি" বলে অব্যাহতি পেতে পারেন না। নুরেমবার্গ ট্রায়ালের (Nuremberg Trials) নীতি অনুসরণ করে সরকারি কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণবিধিতে স্পষ্ট ধারা যুক্ত করতে হবে, যেন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কোনো আদেশ স্পষ্টত মানবাধিকার বিরোধী বা বেআইনি হলে তা অমান্য করার আইনি অধিকার ও সুরক্ষা অধস্তনের থাকে। সত্য উদ্ঘাটন ও ঐতিহাসিক স্মৃতি ফ্যাসিবাদের পতনের পর সমাজকে মুক্ত করতে হলে প্রথম পদক্ষেপ হলো রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সত্য প্রকাশ করা। তাত্ত্বিক দিক: ফরাসি দার্শনিক পল রিকার (Paul Ricœur) তাঁর Memory, History, Forgetting গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা 'অনুমোদিত স্মৃতি' চাপিয়ে দিয়ে প্রকৃত সত্যকে বিকৃত করে। রিকারের মতে, যৌথ ট্রমা (Collective Trauma) নিরাময় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হলো সমাজকে তার 'সুনির্দিষ্ট স্মৃতির অধিকার' (Right to Truth) ফিরিয়ে দেওয়া। প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত: একটি স্বাধীন 'সত্য ও তথ্য অনুসন্ধান কমিশন' (Truth & Fact-finding Commission) গঠন করতে হবে। এই কমিশনের কাজ হবে গুম, খুন, প্রশাসনিক অপব্যবহার ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঠিক ইতিহাস ও পরিসংখ্যান নিরপেক্ষভাবে নথিবদ্ধ করা। আন্তর্জাতিক উদাহরণ: দক্ষিণ আফ্রিকার 'ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন' (TRC) এবং আর্জেন্টিনার 'ন্যাশনাল কমিশন অন দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স অব পারসন্স' (CONADEP)-এর মডেল এখানে অনুসরণযোগ্য। দক্ষিণ আফ্রিকার মডেলের মতো এখানেও শর্তসাপেক্ষ সাধারণ ক্ষমার (Conditional Amnesty) একটি স্পষ্ট আইনি সীমারেখা থাকতে হবে—যেখানে পরোক্ষ সহযোগীদের ক্ষমা পাওয়ার পূর্বশর্ত হবে সত্য প্রকাশ, ভুক্তভোগীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ রাষ্ট্রকে ফেরত দেওয়া। সমস্ত প্রমাণ, ভিডিও এবং নথি একটি সংরক্ষিত ও অপরিবর্তনীয় ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করতে হবে যেন কোনো ভবিষ্যৎ শাসক তা মুছে ফেলতে না পারে। আইনি বিচার প্রক্রিয়া ও দ্বিমুখী বিচারিক মডেল অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করা আইনের শাসনের মূল কথা, তবে তা হতে হবে আইনি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে। জার্মান আইনি দার্শনিক গুস্তাভ রাডব্রুখের বিখ্যাত তত্ত্বে (Radbruch Formula) বলা হয়েছে—"অত্যধিক অন্যায় ও অযৌক্তিক আইন কখনো আইনি বৈধতা পেতে পারে না।" তৎকালীন ফ্যাসিবাদের তৈরি কালো আইন বাতিল করে আন্তর্জাতিক মানের আইন প্রণয়ন জরুরি। তবে নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মূল নীতি ধরে রাখতে হবে—অপরাধের দায় সর্বদা ব্যক্তিগত। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ঢালাওভাবে কাউকে অভিযুক্ত না করে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বিচার পরিচালনা করতে হবে। ট্রাইব্যুনালের মামলার চাপ কমাতে ও কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে একটি দ্বিমুখী বিচারিক মডেল (Two-tier Judicial Model) গ্রহণ করা আবশ্যক: বিচারিক স্তর কাজের ক্ষেত্র ও উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও উদাহরণ ১. বিশেষ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও প্রত্যক্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা। এখানে 'কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি' কঠোরভাবে প্রয়োগ হবে। রোম স্ট্যাটিউট (Rome Statute) অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) সমকক্ষ বিচারিক মান নিশ্চিত করা। কম্বোডিয়ার 'এক্সট্রাঅর্ডিনারি চেম্বার্স' (ECCC)-এর মতো নিরপেক্ষতা রক্ষায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক যুক্ত করা। ২. জাতীয় সত্য, পুনর্মিলন ও বিচার কমিশন প্রশাসনিক অপব্যবহার বা পরোক্ষ সহযোগীদের ক্ষেত্রে ক্ষমার সুযোগ রেখে ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন করা এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা। প্রশাসনিক সংস্কার ও 'লুস্ট্রেশন নীতি'র (Lustration Policy) আদলে ফ্যাসিবাদী অপরাধে জড়িত আমলা ও কর্মচারীদের নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সরকারি চাকরি থেকে বিরত রাখা। দলগত ও সাংগঠনিক জবাবদিহিতা সংগঠন বা রাজনৈতিক দল হিসেবে কোনো গোষ্ঠীকে আইনি জবাবদিহির আওতায় আনতে প্রচলিত রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন বা ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা প্রয়োজন। আইনি সংশোধন: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অপরাধের সংজ্ঞায় 'ব্যক্তি'র পাশাপাশি 'সংগঠন' বা 'রাজনৈতিক দল'-কে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কোনো দল যদি পদ্ধতিগতভাবে গুম, খুন বা মানবতাবিরোধী অপরাধকে দলীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করে, তবে তাকে 'যৌথ অপরাধমূলক উদ্যোগ' (Joint Criminal Enterprise) হিসেবে গণ্য করার ধারা যুক্ত করতে হবে। আইনি এখতিয়ার বিভাজন: ট্রাইব্যুনাল কেবল রাজনৈতিক দলের ফোলজদারি দায় (Criminal Liability) নির্ধারণ করবে। কোনো দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ বা নিবন্ধন বাতিলের সাংবিধানিক সিদ্ধান্তটি ট্রাইব্যুনালের হাতে না রেখে সুপ্রিম কোর্ট বা সাংবিধানিক আদালতের ওপর ন্যস্ত করতে হবে, যাতে বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত ও সুরক্ষাকবচ: জার্মানির সংবিধানের (Basic Law) ২১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি কোনো রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চায়, তবে দেশটির ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট সেই দলকে সরাসরি নিষিদ্ধ করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি পার্টিকে (NSDAP) যেভাবে নিষিদ্ধ এবং তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, সেই নীতি অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে এই আইন যেন ভবিষ্যতে বিরোধী দল দমনের হাতিয়ার না হয়, সেজন্য কোনো নির্বাহী আদেশে নয়, কেবল সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশ্য শুনানিতে অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতেই রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ক্ষতিপূরণ ও ভুক্তভোগীদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার ফ্যাসিবাদের শিকার ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া না গেলে সমাজ কখনোই স্বৈরাচারের ভয়াবহতা থেকে মুক্ত হতে পারে না। ক্ষতিপূরণ প্রদান রাষ্ট্রের কোনো করুণা নয়, এটি ভুক্তভোগীর আইনি ও নাগরিক অধিকার (Right to Reparation)। তাত্ত্বিক দিক: এটি মূলত 'পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার' (Restorative Justice) এবং জাতিসংঘের গৃহীত Basic Principles on Reparation নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়ে নিজেই নিপীড়ক হয়ে ওঠে, তখন সামাজিক চুক্তি (Social Contract) ভেঙে পড়ে। পরবর্তী বৈধ রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই ভুল স্বীকার করে ভুক্তভোগীর পূর্ণ মর্যাদা ফিরিয়ে আনা। বস্তুগত ক্ষতিপূরণ (Material Reparation): ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক ভাতা, নিখরচায় শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা (Psychosocial Support), ভুয়া মামলা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে একটি স্বাধীন 'ক্ষতিপূরণ বোর্ড' গঠন করতে হবে। ফ্যাসিবাদী শাসক ও তাদের দোসরদের বাজেয়াপ্তকৃত সম্পত্তি এবং পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার করে একটি 'জাতীয় ভুক্তভোগী কল্যাণ তহবিল' গঠন করা হবে। প্রতীকী ক্ষতিপূরণ (Symbolic Reparation): রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা, গুম বা নির্যাতনের গোপন আটককেন্দ্রগুলোকে 'স্মৃতি মিউজিয়াম' বা 'স্মারকস্থলে' রূপান্তর এবং ভুক্তভোগীদের নাম জাতীয় স্মৃতি নথিতে সম্মানের সাথে সংরক্ষণ করা। যেমনটি জার্মানি নাৎসি অন্যায়ের (Holocaust) শিকারদের স্মরণে বা চিলি তাদের সামরিক একনায়কতন্ত্রের ভুক্তভোগীদের স্মরণে 'মিউজিয়াম অব মেমোরি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে করেছে। পুনরাবৃত্তি না ঘটার গ্যারান্টি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচারের সবচেয়ে দূরদর্শী স্তম্ভ হলো রাষ্ট্র কাঠামোকে এমনভাবে সাজানো যেন ভবিষ্যতে কোনো শাসক বা দল পুনরায় ফ্যাসিবাদের জন্ম দিতে না পারে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা (Institutional Trust) ফিরে আসে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে কেবল কাগজে-কলমে নয়, পৃথক বিচারিক সচিবালয় ও স্বায়ত্তশাসিত বাজেটের মাধ্যমে প্রশাসনিক ও আর্থিকভবে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা। বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাত থেকে সরিয়ে একটি স্বাধীন 'সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল'-এর কাছে ন্যস্ত করা। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা সংস্কার (Security Sector Reform - SSR): পুলিশ, বিশেষ বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে কোনো দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার চিরতরে বন্ধ করতে হবে। এদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী 'সংসদীয় নজরদারি কমিটি' ও নিরপেক্ষ 'পুলিশি অভিযোগ কমিশন' গঠন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যাতে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ফোনে আড়ি পাততে না পারে, সেজন্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের পরোয়ানা (Warrant) নেওয়া বাধ্যতামূলক করা। আইনি সংশোধন ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা: গুম, বিচারবহির্ভূত আটক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণকারী সমস্ত কালো আইন চিরতরে বাতিল করা। পাশাপাশি গুম বিষয়ক জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সনদ (ICPPED), রোম স্ট্যাটিউট এবং নির্যাতন বিরোধী সনদের (UNCAT) সাথে সংগতি রেখে দেশীয় দণ্ডবিধি সংশোধন করা। উপসংহার: প্রতিশোধমুক্ত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রতিশোধের বৃত্তাকার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি টেকসই সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই আসল ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সমাজের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। ফ্যাসিবাদের সত্যিকারের পরাজয় তখনই নিশ্চিত হবে, যখন নতুন শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সেই একই ফ্যাসিবাদী প্রশাসনিক কাঠামো ও কালো আইনের পুনরাবৃত্তি না করে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও মানবিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলবে। সত্য প্রকাশ, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা, ভুক্তভোগীদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমেই কেবল একটি সম্পূর্ণ স্বৈরাচারমুক্ত, সাম্যভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শুভ সূচনা সম্ভব। ন্যায়বিচার যখন রাজনৈতিক প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে উঠে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, কেবল তখনই একটি রাষ্ট্র প্রকৃত এবং টেকসই গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে যাত্রা শুরু করতে পারে। লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক