ঢাকা: দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং দেশের শীর্ষ ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর মোট ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করেছে। আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান সংস্থাটির প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন। বিএফআইইউ প্রধান জানান, জব্দকৃত সম্পদের মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা সম্পদের পরিমাণ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, আর বিদেশে চিহ্নিত ও জব্দ করা সম্পদের মূল্য ১৯ হাজার কোটি টাকা। এসব সম্পদ অবৈধ উপায়ে অর্জন, কর ফাঁকি এবং অর্থপাচারের মাধ্যমে সঞ্চিত হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন সাংবাদিকদের বলেন, “যে সম্পদ দেশের বাইরে পাচার হয়েছে, তা উদ্ধারে আমরা ইতিমধ্যে সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছি। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্ত সংস্থা ইন্টারপোল ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তাও নেওয়া হবে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিদেশি সম্পদ ফেরত আনতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে বিএফআইইউ গঠিত যৌথ তদন্ত দলের আওতায় থাকা ১০টি গ্রুপ হলো: এস আলম, বেক্সিমকো, নাবিল, সামিট, ওরিয়ন, নাসা, বসুন্ধরা, ডা. ইকবালের প্রিমিয়ার গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের আরামিট গ্রুপ। তদন্তে দেখা গেছে, এই গ্রুপগুলোর অনেকগুলো শেল কোম্পানি, মিথ্যা রপ্তানি বিল এবং ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে দুদক ও সিআইডির সঙ্গে যৌথভাবে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিএফআইইউ জানায়, তদন্তের অংশ হিসেবে এসব গ্রুপ ও শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ২০০টির বেশি ব্যাংক হিসাব স্থগিত বা ফ্রিজ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের বিদেশে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের জমি-জায়গা ক্রয়-বিক্রয়েও স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, “আমরা সন্দেহভাজন আর্থিক লেনদেন দেখলেই ব্যবস্থা নেই, কে কোন দলের, তা আমাদের কাছে মুখ্য নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কেউ যদি অর্থপাচারে জড়িত হন, তদন্তে তা উঠে আসবে এবং তাঁর বিরুদ্ধেও একই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” তাঁর এই বক্তব্য তদন্তে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার বার্তা দিয়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত এক বছরে বিএফআইইউ ৫ হাজারের বেশি সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের প্রতিবেদন (এসটিআর) পেয়েছে, যার মধ্যে ৩০০টির বেশি অর্থপাচার সংশ্লিষ্ট। এ ছাড়া কর ফাঁকি ও কালো টাকা পাচার ঠেকাতে দেশের সব ব্যাংককে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনতে বিএফআইইউ ইতিমধ্যে ‘অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ গঠন করেছে। এই টাস্কফোর্স আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো, যেমন— ইউএন কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট করাপশন (ইউএনসিএসি) এবং ফ্যাটএফের বিধান ব্যবহার করে সম্পদ উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। সংস্থাটি আরও জানায়, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তারা অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ দেশে ফেরত আনতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদী। অর্থনীতিবিদ ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সম্পদ জব্দের উদ্যোগ। তবে শুধু জব্দ করলেই হবে না, দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব সম্পদ জাতীয় কোষাগারে ফিরিয়ে আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।” বিএফআইইউ’র এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে সুশীল সমাজ ও আইনজীবী মহল। তাঁরা মনে করছেন, অর্থপাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ উদ্যোগ যদি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে অন্য পাচারকারীদের জন্য কঠোর বার্তা হয়ে থাকবে। তবে বাস্তবায়ন ও সম্পদ ফেরত আনার জটিল প্রক্রিয়া এখন সময়ের পরীক্ষায়। সব মহল এখন নজর রাখছে বিএফআইইউর পরবর্তী পদক্ষেপ ও বছরের শেষে তাদের অগ্রগতি প্রতিবেদনের দিকে।