প্রকাশ :: ... | ... | ...

অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক : এক অনন্য বুদ্ধিজীবীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা


সংযুক্ত ছবি

সংগৃহীত

প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, চিন্তক, ভাষাসৈনিক ও বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হককে আজ সোমবার (৬ জুলাই) বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। সকালে তাঁর মরদেহ একাডেমি প্রাঙ্গণে আনা হলে সহকর্মী, শিক্ষার্থী, সাহিত্যিক, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, গবেষক সাইমন জাকারিয়া, কবি সরকার আমিনসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, 'আবুল কাশেম ফজলুল হক ছিলেন এক অনন্য প্রতিভাবান বুদ্ধিজীবী। তিনি আমৃত্যু অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, সমাজসচেতন এবং স্বাধীনতাকামী দেশপ্রেমিক ছিলেন। দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তার অবদান অবিস্মরণীয়।' নিজের শিক্ষক হিসেবে স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি তার ছাত্র ছিলাম। তার কাছে বসলেই মনে হতো, যেন এক শান্তিময় বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে আছি।' বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, যিনি অধ্যাপক হকের ছাত্রও ছিলেন, বলেন, 'অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক ছিলেন আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাবন্ধিক, চিন্তক ও সাহিত্যসমালোচক। বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি প্রায় নিয়মিত একাডেমিতে আসতেন। আনুষ্ঠানিক কাজ না থাকলেও এখানে বসে লিখতেন, আলোচনা করতেন এবং একাডেমির বিভিন্ন বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ দিতেন।' শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি, বিশিষ্ট নাগরিক এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেন। আজ বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক গত রোববার (৫ জুলাই) রাজধানীর মিরপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন । তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তিনি স্ত্রী, মেয়ে সুচিতা শারমিন যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। প্রয়াত অধ্যাপকের জীবন ছিল সংগ্রাম ও অর্জনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় জন্মগ্রহণকারী এই বুদ্ধিজীবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময় শিক্ষকতা করেন । বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার সর্বস্তরে ব্যবহার নিশ্চিত করতে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটি'র আহ্বায়ক হিসেবে তিনি বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি 'সুন্দরম' ও 'লোকায়ত' নামে দুটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন এবং 'একুশের ফেব্রুয়ারি আন্দোলন', 'রাজনীতি দর্শন', 'সাহিত্য চিন্তা', 'সংস্কৃতির সহজ কথা'-সহ ২০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। অধ্যাপক হকের ব্যক্তিগত জীবনে ছিল গভীর ট্র্যাজেডি। তাঁর ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন, যিনি জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ছিলেন, ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের হাতে নিহত হন। এই শোক তিনি সাহসের সঙ্গে বহন করেছেন এবং জ্ঞানচর্চা ও ভাষা আন্দোলনে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। সম্প্রতি তিনি 'একটি জাতির জন্ম' শীর্ষক নিবন্ধটিকে 'ঐতিহাসিক দলিল' আখ্যা দিয়ে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করেছিলেন, যা ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল । মুক্তবুদ্ধি, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রগতিশীল চিন্তার উজ্জ্বল প্রতীক এই বুদ্ধিজীবীর মৃত্যুতে দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।