বেলজিয়ামের বিখ্যাত ‘গোল্ডেন জেনারেশন’ হয়তো এখন অতীত। তবে সেই সোনালি সময়ের কথাই যেন মনে করিয়ে দিল বর্তমান দলটি। প্রথমার্ধে দাপুটে ফুটবল উপহার দিয়ে দ্বিতীয়ার্ধেও আধিপত্য ধরে রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে পৌঁছে গেছে বেলজিয়াম। ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে স্বপ্নের ডানায় উড়তে থাকা যুক্তরাষ্ট্র যেন এক ধাক্কায় মুখ থুবড়ে পড়ল। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর এই ম্যাচে গ্যালারি ভরা দর্শককে স্তব্ধ করে দেয় ইউরোপীয় দলটি। বেলজিয়ামের হয়ে প্রথমার্ধে দুটি গোল করেন শার্ল ডি কেটেলারে। দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গোলকিপার ম্যাট ফ্রিজের চরম ভুল কাজে লাগিয়ে ব্যবধান বাড়ান হন্স ফানাকে। শেষ দিকে যোগ করা সময়ে জালে বল জড়ান অভিজ্ঞ রোমেলু লুকাকু। স্বাগতিকদের একমাত্র গোলটি আসে মালিক টিলম্যানের পা থেকে। ম্যাচের আগে যাকে নিয়ে ছিল তোলপাড়—ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোন পেয়ে যার লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করায় ফুটবল বিশ্বজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়—সেই ফোলারাইন বালোগন তেমন কিছু করতে পারেননি। উল্টো ম্যাচের আগের এই ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব নিশ্চিতভাবেই পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলারদের মনস্তত্ত্বে। আগের ম্যাচগুলোর মতো গতিময় ও উজ্জীবিত ফুটবল আর দেখা যায়নি তাদের। চাপে যেন খেই হারিয়ে ফেলে গোটা দল। ঘরের মাঠে বড় স্বপ্ন নিয়ে ছুটতে থাকা দলের পথচলা শেষ হয়ে গেল কোয়ার্টার-ফাইনালের আগেই। এই বিশ্বকাপের তিন স্বাগতিকের কোনোটিই এখন আর টিকে রইল না লড়াইয়ে। ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল ফ্ল্যাঙ্ক দিয়ে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে। অষ্টম মিনিটে প্রথম বড় সুযোগ পায় বেলজিয়াম। ডান দিক থেকে আক্রমণ গড়ে তারা বক্সে নিখুঁত বল পাঠায়। কাছের পোস্টে থাকা ইউরি টিলেমান্স পায়ের পাশ দিয়ে দূরের পোস্টে শট নিতে গিয়ে বল বাইরে মেরে দেন। পরের মিনিটেই এগিয়ে যায় বেলজিয়াম। বক্সের মধ্যে উঁচু বল নিয়ন্ত্রণে আনেন নিকোলা হাসকিন। ডান পোস্টের কাছে থাকা ডি কেটেলারেকে তিনি দেখতে পান এবং তার দিকে চমৎকার পাস বাড়িয়ে দেন। ফাঁকায় থাকা ফরোয়ার্ড অনায়াসেই বল জালে জড়িয়ে দেন। গোলের পরও দাপট ধরে রাখে বেলজিয়াম। চতুর্দশ মিনিটে লেয়ান্দ্রো টোসাডের শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। হাইড্রেশন ব্রেক পর যুক্তরাষ্ট্র একটু গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও আধিপত্য ছিল বেলজিয়ামেরই। তবে স্বাগতিক দল আচমকাই ফ্রি কিক থেকে সমতায় ফেরে। টিলম্যানের শট বেলজিয়ামের মানব দেয়ালে হন্স ফানাকের মাথায় লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে ঢুকে যায়। গোলকিপার তিবো কোর্তোয়া পুরোপুরি হতচকিত হয়ে পড়েন, অসহায় তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার ছিল না তার। গোটা স্টেডিয়াম উল্লাসে ফেটে পড়ে। কিন্তু সেই উল্লাস মিইয়ে যায় দ্রুতই। বেলজিয়ামের জবাব আসে ত্বরিত। গোলের পরপরই আক্রমণে ওঠে তারা এবং বক্সে দুর্দান্ত এক ক্রস করেন ট্রসাড। কাছ থেকে দক্ষতায় হেড করে দলকে আবার এগিয়ে দেন ডি কেটেলারে। ২৫ বছর বয়সী ফরোয়ার্ডের এটি সবশেষ ৯ ম্যাচে ষষ্ঠ গোল। ৪০তম মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপদমুক্ত করেন গোলকিপার ম্যাট ফ্রিজ। কর্নারে নিচু করে বক্সে ক্রস করেন টিলেমান্স, কাছের পোস্টে শট নেন হাসকিন। কিন্তু ফ্রিজ সামলে নিয়ে বল আটকে দেন। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে বালোগনের জোরাল শট বারের ওপর দিয়ে চলে যায়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র বলের নিয়ন্ত্রণ রাখে বেশি। কিন্তু তাদের ভুলই কাজে লাগিয়ে ব্যবধান বাড়ায় বেলজিয়াম। ৫৭তম মিনিটে বক্সে লম্বা বলের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন ডি কেটেলারে। কিন্তু বল নিয়ন্ত্রণে এনে আটকে দেন ফ্রিজ। তখনই তার পেছন থেকে টোকা দিয়ে ডি কেটেলারে বল দেন সামনে হন্স ফানাকের কাছে। সেখান থেকে বাঁকানো শটে ডান কোণা দিয়ে জালে পাঠান ফানাকে। এরপর আর তেমন কোনো সম্ভাবনা জাগাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। শেষ দিকে গিয়ে একটু ধার বাড়ে তাদের আক্রমণে। ৭৯তম মিনিটে অল্পের জন্য বাইরে চলে যায় সেবাস্টিয়ান বারহল্টারের শট। ৮২তম মিনিটে বাঁদিক দিয়ে বক্সে ঢুকে শট নেন বালোগন—সেটি ঠেকিয়ে দেন কোর্তোয়া। উল্টো শেষ সময়ে ব্যবধান আরও বাড়ায় বেলজিয়াম। ফানাকের কাছ থেকে বল পেয়ে ক্রিস রিচার্ডসকে এগিয়ে কোনাকুনি শটে গোল করেন বদলি নামা লুকাকু। বেলজিয়ামের ইতিহাসের সফলতম গোলস্কোরার এই বিশ্বকাপে টানা তিন ম্যাচে গোল করলেন—সবকটিই ৮৬ মিনিটের পরে। কোয়ার্টার-ফাইনালে বেলজিয়াম লড়বে স্পেনের বিপক্ষে, যারা পর্তুগালকে বিদায় করে দিয়েছে।